রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বহুবিবাহ ও কিছু অবান্তর প্রশ্ন
প্রশ্নঃ ১০৩১৭. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আসসালামু আলাইকুম,
আল্লাহ তায়ালা রাসুল (স:) কে একাধিক বিয়ের অনুমতি দিয়েছেন এবং দাসীর সাথে বিবাহ ছাড়াই শারীরিক সম্পর্কে স্থাপনে কোন বাধা নেই বলেই আমি জেনেছি( আমি ভুলও হতে পারি)। আমার আল্লাহর শরীয়াহ মানতে কোনই সমস্যা নেই আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু আমার খটকা লাগে, বিবাহ ছাড়া কি করে সংগম বৈধ হতে পারে।শুনেছি রাসুল (স) এর এক দাসীর গর্ভে ওনার এক পুত্র সন্তান ও লাভ হয় আল্লাহর হুকুমে। এমন আইন কেন আল্লাহ তায়ালা মানুষের জন্য হালাল করলেন ! এখন এই নিয়ম বলবত করা হয়েছে বলেই জানি। আমার প্রশ্ন হচ্ছে এ কেমন আইন ?আর এই ফতোয়ার দোহাই দিয়ে সৌদিআরব এ বহু লোক কাজের বুয়াদের সাথে ও মিলিত হচ্ছে এবং তারা সন্তান লাভ করছে। সেই সন্তান অস্বীকার করার জন্য এয়ারপোর্ট এ নারী কর্মি রা অমানবিক ভাবে নিজেদের সন্তান ফেলে যাচ্ছেন! আল্লাহর আইন এর দোহাই দিয়ে সৌদি পুরুষ রা এমন টি করছে। এগুলো কি হারাম নয়?আর দাসীদের সাথে সংগম কিভাবে বৈধ হতে পারে সে যুগেও।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রিয়ভাই! আপনার প্রশ্নের সহজ উত্তরের সুবিধার্থে আমরা নাতিদীর্ঘ দুটি আলোচনা পেশ করছি। আশা করছি এর মাধ্যমে আপনার সকল খটকা দূর হবে। তাছাড়া ইসলামের দাসী ব্যবাহারের সাথে আপনার কথিত সৌদিনীতির কোনো সাজুয্য আছে কিনা সেটাও অনুধাবন করতে পারবেন।
(এক.)
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বহুবিবাহ ও কিছু অবান্তর প্রশ্ন
বহুল প্রমাণিত ও প্রসিদ্ধ কথা হলো, নবী করীম (সা.) তার পঁচিশ বছর বয়সের পূর্বে কোন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হননি । জাহেলী যুগে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার সরঞ্জাম ছিল সহজলভ্য। ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়াকে কোন ধরনের ত্রুটি মনে করা হতো না বরং তা ছিল পুরুষদের নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। সে সমাজে প্রতিপালিত হয়েও নবী (সা.) ছিলেন পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারী। যার স্বীকৃতি আরববাসীই প্রদান করেছিল।
নবী (সা.) সর্বপ্রথম যাকে বিবাহ করেন সেই খাদিজা (রা.)ও তার চেয়ে পনের বছরের বড়। অপরদিকে তিনি কুমারী ছিলেন না; ছিলেন কয়েক সন্তানের মা। নবী (সা.) এর আমানতদারিতা, সততা ও চরিত্রের পরিচয় পেয়ে খাদিজা (রা.) তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পঁচিশ বছর নির্মল বৈবাহিক জীবন অতিবাহিত করেন । খাদীজার জীবদ্দশায় নবী (সা.) কোন নারীকে বিবাহ করেন নি।
নবী (সা.) এর স্ত্রীদের সংখ্যা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে । তবে নিম্নবর্ণিত নারীগণ যে তার স্ত্রী এতে কোন বিরোধ নাই । ১. হযরত খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ ২. হযরত আয়েশা বিনতে আবি বকর ৩. হযরত সাওদা বিনতে যামআ ৪. হাফসা বিনতে ওমর ৫. যয়নব বিনতে খুযাইমা ৬. উম্মে সালমা বিনতে আবি উমাইয়া ৭. যয়নব বিনতে জাহাশ ৮. জুয়াইরিয়া বিনতে হারিছ ৯. উম্মে হাবিবা বিনতে আবি সুফিয়ান ১০. সাফিয়া বিনতে হুয়াই ১১. মায়মুনা বিনতে হারিছ। আর মারিয়া কিবতিয়া ছিলেন উম্মে ওয়ালাদ। এই এগারজন নারীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি তিনি তাদের সাথে ঘর সংসারও করেছেন । একত্রে নবীর সাথে দাম্পত্য জীবন অতিবাহিতকারীদের সংখ্যা নয়জন।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত খাদীজার জীবদ্দশায় নবী অন্য কোনো নারীকে বিবাহ করেননি । যয়নব বিনতে খুযাইমা ৪র্থ হিজরীতে নবীর জীবদ্দশায় মারা যান। নবী (সা.) এর ইন্তিকালের সময়ে খাদীজা ও যয়নব ব্যতীত অপর নয়জন স্ত্রীই জীবিত ছিলেন । কাজেই প্রশ্নকারী প্রশ্ন করতে পারেন যে, নবী (সা.) একত্রে চারজনের বেশি অর্থাৎ নয়জন নারীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন কেন? উত্তরে বলা যায়, এটি নবীর জন্য খাস । এছাড়া সর্বসম্মতিক্রমে নবীর জন্য এটা জায়েজ। এর পিছনে উলামায়ে কিরাম অনেক হিকমত বা কারণ উল্লেখ করেছেন । নিম্নে উল্লেখযোগ্য কিছু কারণ পেশ করা হলো-
প্রথমত: দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের স্বার্থেই তিনি এত অধিক স্ত্রী গ্রহণ করেছেন। উল্লেখ্য যে, কোন ব্যক্তির স্ত্রীই তার অতিশয় নিকটবর্তী থাকেন, স্ত্রীরা স্বামীর অনেক কিছু জানেন যেটা কিনা বাইরের মানুষ জানে না। এখানে প্রজ্ঞা এটিই যে, নবী (সা.) এর স্ত্রীগণের মাধ্যমে শরীয়তের অনেক বিধান সাব্যস্ত হয়েছে। আর এমন কিছু প্রশ্ন উম্মুল মুমিনীনগণও করেছিলেন যে, প্রশ্নগুলো করতে অন্যরা সাহস পেত না বা সমীচীন মন করত না।
দ্বিতীয়ত: সামাজিক কারণেই নবী অধিক সংখ্যক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। বিভিন্ন গোত্রের সাথে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কারণে সামাজিক বন্ধন বৃদ্ধি পায়।
তৃতীয়ত: রাজনৈতিক কারণেও নবী অধিক সংখ্যক নারীদের বিবাহ করেন । কেননা বাস্তবতা হলো নবী যে সকল গোত্রের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন তারা নীতিগতভাবেই তার বিরুদ্ধাচারণ করতে পারবে না । বিশেষ করে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে তা অনেক সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। যেমন হযরত জুয়াইরিয়াকে বিবাহ করার কারণে বনী মুসতালিক গোত্রের লোকেরা এক পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণ করে। খায়বারের রাজার কন্যা হুয়াই ইবনে আখতাবকে বিবাহ করার কারণও ছিল রাজনৈতিক।
চতুর্থত: তার উন্নত চরিত্রের দাবীই হলো অসহায়, নিঃস্ব, বিশেষ করে শহীদদের স্ত্রীদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন । অনেক বিধবা, নিঃস্ব নারীদেরকে বিবাহ করে তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
পঞ্চমত: রাসূল (সা.) বিবাহের মাধ্যমে সামাজিক সংস্কার করে গেছেন। যেমন- রাসূল (সা.) পালক পুত্রের স্ত্রীকে বিবাহ করার মাধ্যমে বুঝাতে চেয়েছেন পালক পুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকেও বিবাহ করা যায় । কারণ তৎকালীন আরবে এটাকে খারাপ মনে করা হত।
বহুবিবাহের পিছনে কি জৈবিক কারণ ছিল?
কেউ কেউ নবী (সা.) এর বহুবিবাহের পিছনে জৈবিক প্রয়োজনের কথা বলেন । নবী (সা.) যদি শারীরিক প্রয়োজনে বহুবিবাহ করতেন তবে তিনি কুমারীদের বিবাহ করতেন। কিন্তু আমরা দেখি যে, তার স্ত্রীদের মধ্যে হযরত আয়েশাই একমাত্র কুমারী ছিলেন। অন্যরা সন্তানেরা মা অথবা বিধবা ছিলেন। অথচ নবীজী জাবির (রা.) কে বলেছিলেন, কেন তুমি কুমারী বিবাহ করলে না তাহলে সে তোমার সাথে আনন্দ-ফূর্তি করতো আর তুমিও তার সাথে আনন্দ-ফূর্তি করতে?
অন্য হাদীসে বলা হয়েছে, তোমরা কুমারীদের বিবাহ করবে। জৈবিক চাহিদার দাবিই হলো কুমারীদের বিবাহ করা। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, নবী জৈবিক চাহিদার দাবিতে অধিক বিবাহ করেননি। জৈবিক চাহিদার কারণে করলে তিনি কুমারী মেয়েদেরকে বিবাহ করতেন।
নবী (সা.) ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত খাদীজার সাথে সংসার করেন । খাদীজার ইন্তেকালের পর হযরত সাওদা (রা.) এর সাথে বৈবাহিক জীবন যাপন শুরু করেন (তখন পর্যন্ত হযরত আয়েশাকে ঘরে তুলেন নি)। উল্লেখ্য সাওদা (রা.) আরবের একজন বিধবা, অসহায়, অতিশয় বৃদ্ধা ও কুশ্রী ছিলেন। নবীর বয়স চুয়ান্নতে পৌছে যাওয়ার পর তাকে বিবাহ করে সামাজিক আশ্রয় দিয়েছিলেন। তৎকালীন আরবে বিধবাকে বিবাহ করা সামাজিক অশোভন হিসাবে বিবেচিত হত। কাজেই বহুবিবাহের জৈবিক কারণ ছিল না এটি খুবই পরিষ্কার। এরকম কোন কারণ থাকলে তিনি কেন একজন বিধবার সাথে যৌবন অতিবাহিত করেন? প্রথমে খাদিজা তারপর সাওদা (রা)। আধুনিক বিজ্ঞান বলে, মানুষের যত বেশি বয়স বাড়ে, জৈবিক চাহিদা তত কমতে থাকে।
হযরত আয়েশা রা. কে ৬ বছর বয়সে বিবাহ করার কারণ
১. বুখারী শরীফের ৫ম খণ্ডের ২৩৫ নং হাদীস থেকে বুঝা যায় স্বর্গীয় আদেশ পেয়ে রাসূল (সা.) হযরত আয়েশাকে বিবাহ করেন।
২. হযরত আয়েশাকে বিবাহ করার পিছনে রাসূল (সা.) এর জৈবিক কোন কারণ ছিল না । কারণ তাকে বিবাহ করার সময় রাসূল (সা.) এর বয়স প্রায় ৫৪ বছর ছিল।
৩. তৎকালীন আরবে অনেক কম বয়সে মেয়েরা বিবাহের উপযুক্ত হয়ে যেত। আজ থেকে ১৪০০ বছর আগের ভৌগোলিক অবস্থা ভিন্ন ছিল। আধুনিক বিজ্ঞান বলে বিবাহের উপযুক্ততা পরিবেশের উপর নির্ভরশীল। তাছাড়া, ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে মেয়েদের ৯-১৪ বছর বয়সে বিবাহ দেয়া হত।
৪. হযরত আয়েশার সাথে রাসূল (সা.) এর আকদ সম্পূর্ণ হয় ৬ বছর বয়সে, কিন্তু ৯ বছর বয়সে তিনি রাসূলের ঘরে উঠেন। নবী (সা.) এর মাধ্যমে প্রমাণ করতে চেয়েছেন আয়েশা প্রাপ্তবয়স্কা হওয়ার পরে রাসূলের ঘরে যান। তাছাড়া বুখারী শরীফের ৫ম খণ্ডের ২৩৪ নং হাদীস থেকে বুঝা যায়, বিবাহের আগে হযরত আয়েশার শারীরিক পরিবর্তন হয়েছিল।
পরিশেষে বলা যায়, রাসূল (সা.) এর বহুবিবাহের পিছনে কোন জৈবিক কারণ ছিল না, বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বৃহৎ উদ্দেশ্যই ছিলো এর মূল কারণ।
তথ্যসূত্র:-
১. আর রাহীকুল মাখতুম- সফিউর রহমান মুবারকপুরী
২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া- ইবনে কাছীর
(দুই.)
ইসলামকে আক্রমণ করার যতগুলো মোক্ষম অস্ত্র ইসলামবিদ্বেষীদের হাতে রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এই প্রোপাগাণ্ডা যে ইসলাম ক্রীতদাসী ও যুদ্ধ বন্দিনীদের সাথে যৌন-সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছে বরং ক্রীতদাসী ও যুদ্ধবন্দিনীদের যৌনদাসীতে পর্যবসিত করেছে। তাদের এই প্রোপাগাণ্ডায় যে কেউ ভেবে বসতে পারেন, ইসলামই বুঝি ক্রীতদাসী আর যুদ্ধবন্দিনীদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের প্রবর্তক। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে ক্রীতদাসী আর যুদ্ধবন্দিনীদের সাথে অতি প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা যথেচ্ছ, অমানবিক ও অনিয়ন্ত্রিত যৌনাচারকে ইসলাম সীমিত, মানবিক ও নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে আনার পাশাপাশি তাদেরকে জৈবিক চাহিদা পূরণের একটি বৈধ ও মর্যাদাপূর্ণ সুযোগ প্রদান করেছে যার ফলে একদিক দিয়ে তাদের সন্তান জন্মগতভাবে স্বাধীন ও পিতার সম্পদের উত্তরাধিকারী হয়, অন্যদিক সন্তান গর্ভধারণের মাধ্যমে ক্রীতদাস টি ক্রমান্বয়ে মুক্তি লাভ করে। আপনার নিশ্চয়ই জানা আছে যে, হযরত বেলাল রা. ইসলাম গ্রহণের আগে এমনকি ইসলাম গ্রহনের পরও দীর্ঘ সময় দাস ছিলেন। হযরত বারিরা রা. একজন নারী সাহাবী তিনিও ইসলাম গ্রহনের পর দাসি ছিলেন। কাজেই কয়েকটি বিষয় আমাদের ভালোভাবে মনে রাখতে হবে:
প্রাচীন পদ্ধতি
দাসপ্রথার নিয়মকে ইসলামের সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। এটা ইসলামের উদ্ভাবন নয়। বরং এটা অতি প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি। ইসলামের পূর্বে দারিদ্র্য বা যুদ্ধের কারণে মানুষ দাস হতো। ইসলাম একদিকে সমাজে প্রচলিত অমানবিক দাসপ্রথাকে নিজ আওতার ভেতরে মানবিক করতে সচেষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্নভাবে দাসমুক্তকরণের পথ উন্মুক্ত করেছে। কাজেই এই পদ্ধতির একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে।
দাসপ্রথা দূরীকরণের একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া
ইসলাম যখন পৃথিবীতে আসে, তখন দাসপ্রথা এবং যুদ্ধবন্দীদের দাস-দাসীতে রূপান্তর করার প্রক্রিয়াটি সমগ্র বিশ্বে (রোমান, পার্সিয়ান, আরবসহ সব সভ্যতায়) একটি প্রতিষ্ঠিত ও স্বাভাবিক নিয়ম ছিল। তবে কিন্তু ইসলাম এটাকে সমূলে নিষিদ্ধ করলো না কেন?
অনেকেই বিষয়টিকে অতি সরলীকরণ করতে গিয়ে কিংবা নিজেদের অতি মানবিক প্রমাণ করতে গিয়ে চট-জলদি বলে ওঠেন তাহলে ইসলাম একে সমূলে নিষিদ্ধ করলো না কেন? এর উত্তর হচ্ছে, ইসলামের কোনো বিধানই হঠাৎ করে দেওয়া হয়নি। বরং ইসলামের মৌলিক সকল বিধানই ধাপে ধাপে ধীরে ধীরে প্রবর্তিত হয়েছে। নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত, পর্দা, হালাল, হারাম, মদ ইত্যাদী সবগুলোই ধাপে ধাপে এসেছে। দাসপ্রথার ব্যাপারেও ইসলাম একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। ইসলাম যদি হঠাৎ করে একদিনে সব দাসপ্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দিত, তবে তৎকালীন সমাজব্যবস্থা ও অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ত। লাখ লাখ মুক্ত দাস-দাসী হঠাৎ করে গৃহহীন ও কর্মহীন হয়ে চরম বিপর্যয় ও অপরাধের মুখে পড়ত।
ধীরে ধীরে দূরীকরণ:
ইসলাম দাসপ্রথাকে সরাসরি উৎসাহিত করেনি, বরং একে বিলুপ্ত করার একটি দীর্ঘমেয়াদী পথ তৈরি করেছিল। যেমন: যেকোনো ভুলের কাফফারা (পাপমোচন) হিসেবে দাস মুক্ত করা, দাস মুক্ত করার মহান সওয়াবের ঘোষণা এবং দাসদের নিজেদের স্বাধীনতা কিনে নেওয়ার (মুকাতাব) আইনি অধিকার দেওয়া।
যুদ্ধবন্দী নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা
প্রাচীনকালের যুদ্ধগুলোতে যখন কোনো পক্ষ হেরে যেত, তখন তাদের পুরুষরা নিহত বা বন্দী হতো। এর ফলে বিজিত পক্ষের নারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়ত। নারীদের দাসীরূপে গ্রহণ না করলে তৎকালীন বিকল্পগুলো কী ছিল?
১. তাদের মরুভূমিতে অনাহারে-অর্ধাহারে মরার জন্য ফেলে রাখা। (এটা কিছুতেই সমর্থনযোগ্য নয়।)
২. তাদের কারাগারে আজীবন বন্দী রাখা, যা রাষ্ট্রের জন্য বড় অর্থনৈতিক বোঝা।
৩. তাদের সমাজে ছেড়ে দেওয়া, যেখানে কোনো অর্থনৈতিক বা সামাজিক নিরাপত্তা না থাকায় তারা পতিতাবৃত্তি বা চরম নির্যাতনের শিকার হতো।
ইসলামের সমাধান:
ইসলাম তৎকালীন বৈশ্বিক নিয়ম অনুযায়ী তাদের বন্দী করার অনুমতি দিলেও, তাদের সমাজের বিভিন্ন পরিবারের দায়িত্বের মধ্যে বণ্টন করে দেয়। এটি ছিল মূলত তাদের এক ধরণের আশ্রয় ও পুনর্বাসন দেওয়া।
এটি কি "ধর্ষণ" বা ঢালাও যৌন নির্যাতন ছিল?
আধুনিক অর্থে 'ধর্ষণ' বলতে যা বোঝায়, ইসলামের যুদ্ধবন্দী নারীদের বিধান তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। একে ঢালাও যৌন নির্যাতন বলার সুযোগ নেই, কারণ এর পেছনে কঠোর আইনি ও মানবিক বিধি-নিষেধ ছিল:
অধিকার ও সুরক্ষামূলক নিয়ম:
একজন বন্দী নারী কেবল একজন নির্দিষ্ট মালিকের অধীনেই থাকতেন। ক্যাম্পের বা সমাজের যেকোনো পুরুষ এসে তার ওপর চড়াও হতে পারত না (যা তৎকালীন অন্য সব সেনাবাহিনীতে "গণধর্ষণ" বা যুদ্ধের ট্রফি হিসেবে ঘটত)। এটি তাকে দলগত বা সঙ্গবদ্ধ যৌন নির্যাতন থেকে সুরক্ষা দিত।
গর্ভধারণ ও আজীবন মুক্তি (উম্মুল ওয়ালাদ):
যদি কোনো বন্দী নারী তার মালিকের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিতেন, তবে ইসলামে সেই নারীর মর্যাদা তাৎক্ষণিকভাবে অনেক বেড়ে যেত। তাকে আর বিক্রি করা যেত না এবং মালিকের মৃত্যুর সাথে সাথে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়ে যেতেন। তার সন্তানও স্বাধীন নাগরিক হিসেবে বাবার সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকার পেত। এটি ছিল দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে নারীদের বের করে আনার একটি বড় মাধ্যম। হযরত মারিয়া কিবতিয়া রা. এর গর্ভে নবী সা. এর সন্তান ইবরাহিম রা. এর সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত।
দাসীর জৈবিক চাহিদা পুরণ
ক্রীতদাসীর সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনের অধিকার দাসপ্রথার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, ইসলামের কোন অপরিহার্য, অবশ্য করণীয়, অথবা কাঙ্ক্ষিত বিষয় নয়। ইসলাম নিজ গণ্ডির ভেতরে এই বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করেছে মাত্র। তা ছাড়া যৌন চাহিদা কেবল পুরুষের মাঝেই সীমাবন্ধ নয়; বরং পুরুষের পুরুষের পাশাপাশি নারীও এই চাহিদার আওতাভূক্ত। কাজেই মনিবকে ব্যবহারের অনুমতি বাস্তবে উভয়ের চাহিদার মাঝে সমন্বয় ঘটানো।
মানবিক আচরণ:
ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, দাস-দাসীদের নিজেরা যা খাওয়া হবে তা খাওয়াতে হবে, যা পরিধান করা হবে তা পরাতে হবে এবং তাদের ক্ষমতার বাইরে কোনো কাজ চাপানো যাবে না।
ইতিহাসের আপেক্ষিকতা (Historical Relativity):
এখন যারা এটাকে ইসলামকে আঘাত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে তারা মূলত প্রাচীণ একটি যুদ্ধকালীন ও সামাজিক বাস্তবতাকে একবিংশ শতকের আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন বা জেনেভা কনভেনশনের আলোকে বিচার করার চেষ্টা করছে; যা কিছুতেই যৌক্তিক নয়। আজ থেকে ১০০০ বছর আগে যা একটি মানবিক পুনর্বাসন ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হতো, কালের পরিক্রমায় সমায়ের বাস্তবতায়, বৈশ্বিক পরিবর্তনে আজ তা ভিন্ন মনে হতে পারে। এটাই স্বাভাবিক। কেবল যে, অমুসলিম নারীরা মুসলিমদের হাতে বন্দী হলে মুসলিমরা তাদের দাসী বানিয়ে রাখতো তা নয় বরং তৎকালীন সময়ে মুসলিম নারীরা অমুসলিমদের হাতে বন্দী হলে তাদের সাথেও একই আচরণ করা হতো। এটি ছিল তৎকালীন সময়ের আন্তর্জাতিক যুদ্ধরীতির অংশ। ইসলামের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল দাসত্ব বিলোপ। ফলে ইসলাম এমন আইন তৈরি করেছিল যাতে সময়ের সাথে সাথে দাসপ্রথা পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী দাসপ্রথা নিষিদ্ধ এবং মুসলিম বিশ্বও আন্তর্জাতিক চুক্তি (যেমন জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ) মেনে দাসপ্রথা ও যুদ্ধবন্দীদের দাস বানানোর প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছে, যা ইসলামের মূল লক্ষ্যের (দাসত্ব মুক্তি) সাথেই সংগতিপূর্ণ।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, এটি কোনো কামুকতা বা নারীদের ওপর নির্যাতন চালানোর জন্য দেওয়া কোনো লাইসেন্স ছিল না; বরং তৎকালীন বর্বর বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে নারীদের দলগত নির্যাতন থেকে রক্ষা করা, সমাজে তাদের একটি নির্দিষ্ট পরিবারের অধীনে আশ্রয় দেওয়া এবং ক্রমান্বয়ে তাদের দাসত্ব থেকে মুক্ত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া ছিল।
প্রিয় প্রশ্নকারী!
আপনার প্রশ্নের শেষাংশ ছিল মুসলিম ও অমুসলিমদের এই বিষয়টি যেভাবে বোঝাবেন? তার সহজ উত্তর হলো, কাউকে কিছু বুঝাতে হলে আপনার আগে সেই বিষয়ে পরিপক্ক ধারণা এবং জানাশোনা থাকতে হবে। কাজেই কোনো অমুসলিম কিংবা সংশয়বাদী মুসলিমকে বিষয়টি বুঝানোর আগে আপনি এই বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ইলিম হাসিল করুন। সহায়িকা স্বরূপ মাও. আব্দুর রহিম রহ. লিখিত দাসপ্রথা ও ইসলাম বইটি অধ্যয়ন করতে পারেন।
كما قال الله تعالى فى القران الكريم. [النور: 33] : {وَلَا تُكْرِهُوا فَتَيَاتِكُمْ عَلَى الْبِغَاءِ إِنْ أَرَدْنَ تَحَصُّنًا لِتَبْتَغُوا عَرَضَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَنْ يُكْرِهْهُنَّ }
وأخرج الإمام البخاري فى صحيحه :1/344 - عن أبي هريرة : عن النبي صلى الله عليه و سلم قال ( من أعتق رقبة مسلمة أعتق الله بكل عضو منه عضوا من النار حتى فرجه بفرجه )
وأخرج الإمام البخاري فى صحيحه :1/346- قال: رأيت أبا ذر الغفاري رضي الله عنه وعليه حلة، وعلى غلامه حلة، فسألناه عن ذلك، فقال: إني ساببت رجلا، فشكاني إلى النبي صلى الله عليه وسلم، فقال لي النبي صلى الله عليه وسلم: «أعيرته بأمه»، ثم قال: «إن إخوانكم خولكم جعلهم الله تحت أيديكم، فمن كان أخوه تحت يدهفليطعمه مما يأكل، وليلبسه مما يلبس، ولا تكلفوهم ما يغلبهم، فإن كلفتموهم ما يغلبهم أعينوهم»
وأخرج الإمام مسلم فى صحيحه (5/ 90): قال أتيت ابن عمر وقد أعتق مملوكا – قال – فأخذ من الأرض عودا أو شيئا فقال ما فيه من الأجر ما يسوى هذا إلا أنى سمعت رسول الله -صلى الله عليه وسلم- يقول « من لطم مملوكه أو ضربه فكفارته أن يعتقه ».
وأخرج الإمام أبو داود فى سننه :702 -قال: سمعت عبد الله بن عمر يقول: جاء رجل إلى النبي صلى الله عليه وسلم، فقال: يا رسول الله، كم نعفو عن الخادم؟ فصمت، ثم أعاد عليه الكلام، فصمت، فلما كان في الثالثة، قال: «اعفوا عنه في كل يوم سبعين مرة»
وأخرج الإمام أحمد فى مسنده (44/ 261) - عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ حُضِرَ جَعَلَ يَقُولُ الصَّلَاةَ الصَّلَاةَ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ فَجَعَلَ يَتَكَلَّمُ بِهَا وَمَا يَكَادُ يَفِيضُ بِهَا لِسَانُهُ
ويراجع أيضا: فتاوى رحيميه:1/217
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
বাইতুল কুরআন মাদারাসা , মোহাম্মাদপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন