বারবার বিপদ আসার কারণ কি?
প্রশ্নঃ ১৩৭৬৭৪. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, বারবার বিপদ আসার কারণ কি? বিপদ দূর করার জন্য কি আমল করবো?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
জীবনে বারবার বিপদ আসা বা কষ্টের সম্মুখীন হওয়াটা মানুষের জন্য খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কুরআন ও হাদিসের আলোকে বারবার বিপদ আসার কিছু কারণ নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ঈমানের পরীক্ষা
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, তিনি মুমিনদের পরীক্ষা করবেন। যার ঈমান যত শক্তিশালী, তার পরীক্ষাও তত কঠিন হয়।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হিয়েছে,
وَلَنَبۡلُوَنَّکُمۡ بِشَیۡءٍ مِّنَ الۡخَوۡفِ وَالۡجُوۡعِ وَنَقۡصٍ مِّنَ الۡاَمۡوَالِ وَالۡاَنۡفُسِ وَالثَّمَرٰتِ ؕ وَبَشِّرِ الصّٰبِرِیۡنَ ۙ
অর্থঃ আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব (কখনও) কিছুটা ভয়-ভীতি দ্বারা, (কখনও) ক্ষুধা দ্বারা এবং (কখনও) জান-মাল ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। সুসংবাদ শোনাও তাদেরকে, যারা (এরূপ অবস্থায়) সবরের পরিচয় দেয়। (সূরাঃ আল বাকারা - আয়াত নংঃ 155)
নবী-রাসূলগণের জীবনে সবচেয়ে বেশি বিপদ আসত। সুতরাং বিপদ আসা মানেই আল্লাহ আপনার উপর অসন্তুষ্ট—এমনটা ভাবা ভুল। এটি আপনার ধৈর্যের পরীক্ষা হতে পারে।
২. গুনাহ মাফ ও মাকাম বৃদ্ধি
কখনো কখনো আল্লাহ তাআলা বান্দাকে দুনিয়াতে ছোটখাটো বিপদ দিয়ে তার অতীতের গুনাহগুলো মুছে দিতে চান, যেন আখেরাতে তাকে আর শাস্তি ভোগ করতে না হয়।
হাদীস শরীফে এসেছে,
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلاَ وَصَبٍ وَلاَ هَمٍّ وَلاَ حُزْنٍ وَلاَ أَذًى وَلاَ غَمٍّ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا، إِلاَّ كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ ".
আবু সা‘ঈদ খুদরী ও আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, নবী করীম (ﷺ) বলেছেনঃ মুসলিম ব্যক্তির উপর যে সকল যাতনা, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানী আপতিত হয়, এমন কি যে কাটা তার দেহে বিদ্ধ হয়, এ সবের দ্বারা আল্লাহ তার গুনাহ সমুহ ক্ষমা করে দেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস নংঃ ৫৬৪১ - ৫৬৪২)
৩. আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনা
মানুষ যখন অনেক দিন সুখে থাকে, তখন অনেক সময় সে আল্লাহকে ভুলে যায় বা ইবাদতে অলসতা করে। তখন আল্লাহ তাকে ছোট কোনো বিপদ দিয়ে সতর্ক করেন, যেন সে পুনরায় আল্লাহর দিকে ফিরে আসে এবং তওবা করে। বিপদ মানুষকে বিনয়ী হতে শেখায় এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গভীর করে।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হিয়েছে,
وَلَقَدۡ اَخَذۡنٰہُمۡ بِالۡعَذَابِ فَمَا اسۡتَکَانُوۡا لِرَبِّہِمۡ وَمَا یَتَضَرَّعُوۡنَ
অর্থঃ আমি তো তাদেরকে (একবার) শাস্তিতে ধৃত করেছিলাম। তখনও তারা নিজ প্রতিপালকের সামনে নত হয়নি এবং তারা তো কোন রকম অনুনয়-বিনয় করে না। (সূরাঃ আল মু'মিনূন - আয়াত নংঃ 76)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, বিপদ-আপদের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানুষকে আল্লাহ তায়ালার দিকে ফিরিয়ে আনা, তাঁর সামনে বিনয়ী করা এবং অনুনয়-বিনয়ের মাধ্যমে তাঁর কাছে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা।
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,
وَلَنُذِیۡقَنَّہُمۡ مِّنَ الۡعَذَابِ الۡاَدۡنٰی دُوۡنَ الۡعَذَابِ الۡاَکۡبَرِ لَعَلَّہُمۡ یَرۡجِعُوۡنَ
অর্থঃ এবং সেই বড় শাস্তির আগে আমি তাদেরকে অবশ্যই লঘু শাস্তির স্বাদও গ্রহণ করাব। হয়ত তারা ফিরে আসবে। (সূরাঃ আস সিজদাহ্ - আয়াত নংঃ 21)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,
وَاِذَا مَسَّ الۡاِنۡسَانَ الضُّرُّ دَعَانَا لِجَنۡۢبِہٖۤ اَوۡ قَاعِدًا اَوۡ قَآئِمًا ۚ فَلَمَّا کَشَفۡنَا عَنۡہُ ضُرَّہٗ مَرَّ کَاَنۡ لَّمۡ یَدۡعُنَاۤ اِلٰی ضُرٍّ مَّسَّہٗ ؕ کَذٰلِکَ زُیِّنَ لِلۡمُسۡرِفِیۡنَ مَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ
অর্থঃ মানুষকে যখন দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে শুয়ে, বসে ও দাঁড়িয়ে (সর্বাবস্থায়) আমাকে ডাকে। তারপর আমি যখন তার কষ্ট দূর করে দেই, তখন সে এমনভাবে পথ চলে যেন সে কখনও তাকে স্পর্শ করা কোনও বিপদের জন্য আমাকে ডাকেইনি! যারা সীমালংঘন করে তাদের কাছে নিজেদের কৃতকর্মকে এভাবেই মনোরম করে তোলা হয়েছে। (সূরাঃ ইউনুস - আয়াত নংঃ 12)
৪. গুনাহের পরিণাম
মাঝে মাঝে আমাদের নিজেদের কৃতকর্ম বা গুনাহের ফলেও বিপদ আসে। এটি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হিয়েছে,
وَمَاۤ اَصَابَکُمۡ مِّنۡ مُّصِیۡبَۃٍ فَبِمَا کَسَبَتۡ اَیۡدِیۡکُمۡ وَیَعۡفُوۡا عَنۡ کَثِیۡرٍ ؕ
অর্থঃ তোমাদের যে বিপদ দেখা দেয়, তা তোমাদের নিজ হাতের কৃতকর্মেরই কারণে দেখা দেয়। আর তিনি তোমাদের অনেক কিছুই (অপরাধ) ক্ষমা করে দেন। (সূরাঃ আশ্-শূরা - আয়াত নংঃ 30)
বিপদ থেকে মুক্তির জন্য ৬টি শক্তিশালী আমল:
১. সবর বা ধৈর্য ধরা
২. বেশি বেশি ইস্তিগফার করা
৩. বেশি বেশি দু'আ ইউনুস পাঠ করা
৪. আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল (ভরসা) করা
৫. নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়া
৬. দান সাদকার মাধ্যমে বিপদ মুক্তি কামনা করা
রাতের অন্ধকার যত গভীর হয়, ভোরের আলো তত কাছে থাকে। আপনার বর্তমান কঠিন সময়টি হয়তো আপনার জন্য অনেক বড় কোনো কল্যাণের দরজা খুলে দেবে।
আমাদের সীমিত বুদ্ধি দিয়ে আমরা অনেক সময় ভালো-মন্দের পার্থক্য করতে পারি না। কোনো বিপদে পড়লে আমরা অস্থির হয়ে যাই, অথচ সেই বিপদের মাধ্যমেই হয়তো আল্লাহ আমাদের কোনো বড় ক্ষতি থেকে বাঁচান কিংবা আমাদের জন্য স্থায়ী কোনো কল্যাণের পথ খুলে দেন।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হিয়েছে,
کُتِبَ عَلَیۡکُمُ الۡقِتَالُ وَہُوَ کُرۡہٌ لَّکُمۡ ۚ وَعَسٰۤی اَنۡ تَکۡرَہُوۡا شَیۡئًا وَّہُوَ خَیۡرٌ لَّکُمۡ ۚ وَعَسٰۤی اَنۡ تُحِبُّوۡا شَیۡئًا وَّہُوَ شَرٌّ لَّکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ وَاَنۡتُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ
অর্থঃ তোমাদের প্রতি (শত্রুর সাথে) যুদ্ধ ফরয করা হয়েছে, আর তোমাদের কাছে তা অপ্রিয়। এটা তো খুবই সম্ভব যে, তোমরা একটা জিনিসকে মন্দ মনে কর, অথচ তোমাদের পক্ষে তা মঙ্গলজনক। আর এটাও সম্ভব যে, তোমরা একটা জিনিসকে পছন্দ কর, অথচ তোমাদের পক্ষে তা মন্দ। আর (প্রকৃত বিষয় তো) আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না। (সূরাঃ আল বাকারা - আয়াত নংঃ 216)
এই আয়াতটি আমাদের শেখায় যে, আমাদের ইচ্ছার চেয়ে আল্লাহর পরিকল্পনা অনেক বেশি নিখুঁত।
রাসূলুল্লাহ (সা.) মুমিনের অবস্থা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন:
" عَجَبًا لأَمْرِ الْمُؤْمِنِ إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ وَلَيْسَ ذَاكَ لأَحَدٍ إِلاَّ لِلْمُؤْمِنِ إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ " .
মু’মিনের অবস্থা ভারী অদ্ভুত। তাঁর সমস্ত কাজই তাঁর জন্য কল্যাণকর। মু’মিন ব্যতিত অন্য কারো জন্য এ কল্যাণ লাভের ব্যাবস্থা নেই। তাঁরা আনন্দ (সুখ শান্তি) লাভ করলে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে, তা তাঁর জন্য কল্যাণকর হয়, আর দুঃখকষ্টে আক্রান্ত হলে ধৈর্যধারণ করে, এও তাঁর জন্য কল্যাণকর হয়। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নংঃ ২৯৯৯)
পরিশেষে: আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর অটল থেকে তাঁর কাছে কল্যাণ কামনা করাই হলো প্রকৃত ঈমানদারের পরিচয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তৌফিক দান করুন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, দারুল কুরআন আল ইসলামিয়া মাদ্রাসা
মুহাম্মদপুর, ঢাকা
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন