অর্থনৈতিক সংকটে দ্বিতীয় বিয়ে: শরিয়তের দৃষ্টিতে করণীয়
প্রশ্নঃ ১৫৮২৮১. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, স্রীর কাছ থেকে জরুরত পূরণ না হওয়াতে গুনাহ থেকে বাচার জন্য আবার বিয়ে করতে পারি? আর্থিক স্বচ্ছলতা কম। করণীয় কি?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রিয় ভাই, স্ত্রীর কাছ থেকে শারীরিক বা মানসিক কোনো জরুরত পূরণ না হওয়ার কারণে গুনাহে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে, নিজেকে পবিত্র রাখার জন্য দ্বিতীয় বিবাহ করার চিন্তা করা ইসলামে বৈধ। তবে আপনার বর্তমান আর্থিক অসচ্ছলতার বিষয়টি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
* যদি আপনার আর্থিক অবস্থা এমন হয় যে, আপনি দ্বিতীয় স্ত্রীর ন্যূনতম ভরণপোষণ দিতে পারবেন না, তবে এই মুহূর্তে বিয়ে না করে রোজা রাখা, স্ত্রীর সাথে দূরত্ব মেটানোর চেষ্টা করা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকাই আপনার জন্য শরীয়তসম্মত উত্তম পথ। পরবর্তীতে আল্লাহ সামর্থ্য দিলে আপনি অবশ্যই নিয়ম মেনে দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন।
* আর্থিক অসচ্ছলতা ও দ্বিতীয় বিবাহের শর্ত
ইসলামে একজন পুরুষকে একাধিক বিবাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে ঠিকই, তবে তা দুটি অত্যন্ত জরুরি শর্তের সাথে শর্তযুক্ত:
ক) আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্য: দ্বিতীয় স্ত্রীর মোহরানা, তার আলাদা থাকা-খাওয়া এবং ভরণপোষণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার আর্থিক সক্ষমতা থাকতে হবে।
খ) সমতা ও ন্যায়বিচার (عدل): দুই স্ত্রীর মাঝে দিনযাপন, খরচ এবং অধিকারের ক্ষেত্রে শতভাগ সমতা বজায় রাখতে হবে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট বলেছেন:
فَانْكِحُوْا مَا طَابَ لَكُمْ مِّنَ النِّسَآءِ مَثْنٰى وَ ثُلٰثَ وَ رُبٰعَۚ-فَاِنْ خِفْتُمْ اَلَّا تَعْدِلُوْا فَوَاحِدَةً ……. ذٰلِكَ اَدْنٰۤى اَلَّا تَعُوْلُوْا
অন্য নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের পছন্দ হয় বিবাহ কর দুই-দুইজন, তিন-তিনজন অথবা চার-চারজনকে। অবশ্য যদি আশংকা বোধ কর যে, তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) মধ্যে সুবিচার করতে পারবে না, তবে এক স্ত্রীতে ক্ষান্ত থাক …… এতে তোমাদের পক্ষপাতিত্ব না করার সম্ভাবনা বেশি। (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩)
* যেহেতু আপনার আর্থিক স্বচ্ছলতা কম, তাই এই অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করলে আপনি যদি স্ত্রীদের হক বা ভরণপোষণ ঠিকমতো দিতে না পারেন, তবে তা আরেকটি বড় গুনাহের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
* শরয়ী সমাধান
যতক্ষণ না আপনার আর্থিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে, ততক্ষণ গুনাহ থেকে বাঁচতে এবং নিজের জরুরত পূরণের জন্য নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে পারেন:
ক) স্ত্রীর সাথে খোলাখুলি ও আন্তরিক আলোচনা
আপনার সমস্যার কথা আপনার স্ত্রীকে অত্যন্ত নম্রতা ও ভালোবাসার সাথে বুঝিয়ে বলুন। তাকে বোঝান যে, আপনার জরুরত পূরণ হওয়াটা আপনার দ্বীন ও চরিত্র রক্ষার জন্য কতটা জরুরি। অনেক সময় অবহেলা বা ক্লান্তির কারণে এমন হতে পারে, যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব।
খ) হাদীসে বর্ণিত সমাধান রোজা রাখা (রাসুলুল্লাহ সা.-এর নির্দেশনা)
আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে যারা বিয়ে করতে সমর্থ নয়, তাদের জন্য আল্লাহর রাসুল (সা.) একটি চমৎকার প্রেসক্রিপশন দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
قَالَ لَنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ " .
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের বলেছেনঃ হে যুব সমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বৈবাহিক জীবনের ব্যয়ভার বহনে সক্ষম সে যেন বিয়ে করে। কারণ তা দৃষ্টিকে নিচু করে দেয় এবং লজ্জাস্থানকে সংরক্ষণ করে। আর যে (ভরণ-পোষণে) সমর্থ না হয়, সে যেন রোযা পালন করে। কারণ তা তার যৌন কামনা দমনকারী। (সহীহ মুসলিম-১৪০০)
* নিয়মিত নফল রোজা রাখলে তা কুপ্রবৃত্তি ও গুনাহের চিন্তা থেকে মনকে দূরে রাখতে দারুণ ভাবে সাহায্য করে। পাশাপাশি চোখের হিফাজত, পরিবেশ পরিবর্তন ও বেশি বেশি দু’আ ইস্তিগফারে মসগুল থাকা।
আল্লাহর কাছে নিজের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার জন্য এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার জন্য বেশি বেশি দু’আ করুন। বিশেষ করে এই দু'আটি পড়তে পারেন:
اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাকফিনী বিহালালিকা আন হারামিকা, ওয়া আগনিনী বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াক।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে আপনার হালাল রিজিক দিয়ে হারাম থেকে বাঁচান এবং আপনার অনুগ্রহে আপনি ছাড়া অন্য সবার থেকে আমাকে ধনী (স্বাবলম্বী) করে দিন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, দারুল কুরআন আল ইসলামিয়া মাদ্রাসা
মুহাম্মদপুর, ঢাকা
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন