অনলাইনে হালাল ইনকামের শর্তাবলী
প্রশ্নঃ ১৬৪৩৬৬. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, সম্মানিত মুফতি সাহেব, কোন নীতিমালার ভিত্তিতে অনলাইনে কোনো আয়ের মাধ্যমকে শরিয়তসম্মত বা শরিয়তবিরোধী বলা হয়? ফিকহের আলোকে জানালে উপকৃত হব।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রথম কথা হচ্ছে, অনলাইনে আয়ের মাধ্যম একটি বা দুটি নয় যে, সুনির্দিষ্ট করে প্রতিটি ক্ষেত্র নিয়ে আদ্যোপান্ত কথা বলা সম্ভব। তবে হ্যাঁ, আমরা যদি মৌলিকভাবে ভাগ করি তাহলে বলতে পারি হয়ত সেটি ব্যবসা বা ক্রয়-বিক্রয়, অথবা সার্ভিস প্রোভাইডের মাধ্যমে আয়-এর মধ্যে পড়বে।
সুতরাং অনলাইন আয়কে মৌলিকভাবে দুটি শাখায় ভাগ করা যায়:
এক. ব্যবসা (ক্রয়-বিক্রয়)
দুই. সেবা প্রদান (সার্ভিস প্রোভাইডিং)
দ্বিতীয়ত, উভয় ক্ষেত্রে আয় হালাল হওয়ার জন্য অফলাইনের বেচাকেনা ও চুক্তির যে শর্তাবলি রয়েছে, সেগুলো অনলাইনেও প্রযোজ্য হবে।। হ্যাঁ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োগ বা বাস্তবায়নের বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে।
ক. অনলাইনে বেচাকেনা শুদ্ধ হওয়ার মৌলিক শর্তাবলি:
১. পণ্যের সঠিক ও সত্য বিবরণ: পণ্যের কাঁচামাল, গুণাগুণ, পরিমাণ, উৎপাদক প্রতিষ্ঠান, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখসহ সব জরুরি তথ্য সুস্পষ্ট থাকতে হবে। কোনো ধরনের মিথ্যা তথ্য দিলে বেচাকেনা শুদ্ধ হবে না।
২. মালিকানা বা বৈধ প্রতিনিধিত্ব : বিক্রেতার কাছে পণ্যটি হস্তগত বা তার মালিকানায় থাকতে হবে। নিজের মালিকানায় না থাকলে, মূল মালিক বা উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিনিধি বা এজেন্ট হিসেবে যথাযথ চুক্তি করে নিতে হবে।
৩. হালাল পণ্য : বিক্রিত পণ্যটি ইসলামী শরীয়তে বৈধ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে হবে। সুতরাং মদ, শূকরের গোশত, গায়রুল্লাহর নামে জবাই করা পশুর গোশত বা পুরুষদের জন্য খাঁটি রেশমি পোশাক ইত্যাদির ব্যবসা জায়েজ নয়।
৪. ক্রেতা-বিক্রেতার যোগ্যতা: ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়কেই সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী এবং ভালো-মন্দ বোঝার মতো বয়সের (মুমায়্যিজ) হতে হবে। অবুঝ শিশু বা মানসিক রোগীর সাথে বেচাকেনা শুদ্ধ নয়।
৫. পণ্য দেখে বাতিল করার অধিকার : অনলাইনে কেনা পণ্য হাতে পাওয়ার পর তা বাস্তবে দেখে ক্রেতার তা গ্রহণ বা বর্জন করার অধিকার থাকতে হবে। বর্জন করলে ক্রেতার ওপর অযৌক্তিক কোনো খরচ চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।
অনলাইন ব্যবসাকে হালাল ও সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত রাখতে হলে লেনদেনটি অবশ্যই নিচের চারটি বিষয় থেকে মুক্ত হতে হবে:
গারার: প্রতারণা বা অস্পষ্টতা।
দারার: ঠকানো বা অপরের ক্ষতি করা।
গিশ: পণ্যে ভেজাল দেওয়া বা দোষ গোপন করা।
ইসতিগলাল: অন্যের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অনৈতিক ফায়দা লোটা।
খ. অনলাইনে সেবা প্রদানের মাধ্যমে ইনকাম হালাল হওয়ার মৌলিক শর্তাবলি
১. কাজের ধরন হালাল হওয়া: আপনি যে সেবাটি দিচ্ছেন তার মূল কাজ শরীয়তে বৈধ হতে হবে। যেমন— সাধারণ ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, অনুবাদ বা হালাল ব্যবসার গ্রাফিক্স ডিজাইন করা বৈধ। কিন্তু সুদী প্রতিষ্ঠানের হিসাব রাখা, জুয়ার সাইট তৈরি করা বা অশ্লীল কন্টেন্ট প্রমোট করা জায়েজ নেই।
২. পারিশ্রমিক নির্দিষ্ট থাকা: কাজটি করে দিলে ঠিক কত টাকা বা পারিশ্রমিক পাওয়া যাবে, তা চুক্তির সময়ই স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকতে হবে। পারিশ্রমিক অস্পষ্ট রাখলে ইজারার চুক্তি ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যায়।
৩. কাজের বিবরণ ও পরিমাণ সুস্পষ্ট হওয়া: ক্লায়েন্টকে ঠিক কী পরিমাণ কাজ করে দিতে হবে, কাজের ধরন কেমন হবে বা কত ঘণ্টা সময় দিতে হবে, তা শুরুতেই পরিষ্কারভাবে ঠিক করে নিতে হবে।
৪. ধোঁকা ও প্রতারণামুক্ত হওয়া: কাজ পাওয়ার জন্য নিজের দক্ষতা সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দেওয়া, অন্যের করা কাজকে নিজের পোর্টফোলিও হিসেবে চালানো বা ফেক রিভিউ কেনা সম্পূর্ণ নাজায়েজ।
৫. চুক্তি ও আমানত রক্ষা করা: চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সততা ও আমানতদারির সাথে কাজ সম্পন্ন করে ক্লায়েন্টকে বুঝিয়ে দেওয়া জরুরি। কাজে ফাঁকিবাজি করা বা ইচ্ছাকৃত নিম্নমানের কাজ দেওয়া জায়েজ নয়।
৬. গুনাহের কাজে সহায়তা না করা: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, "তোমরা নেক কাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরকে সাহায্য করো, কিন্তু গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সাহায্য কোরো না।" (সূরা মায়িদা: ২)। তাই এমন কোনো সার্ভিস দেওয়া যাবে না, যা সরাসরি হারাম বা গুনাহের কাজে ব্যবহৃত হয়।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, বিজ্ঞাপন বা কনটেন্ট-ভিত্তিক আয় (যেমন ইউটিউব, ব্লগিং, স্পন্সরশিপ) আলাদা কোনো তৃতীয় শাখা নয়, বরং এটাও মূলত সেবা প্রদানেরই একটি রূপ। এখানে কনটেন্ট নির্মাতা তার দর্শক/পাঠকের প্ল্যাটফর্মের স্পেস বিজ্ঞাপনদাতাকে সেবা হিসেবে প্রদান করেন, বিনিময়ে অর্থ পান। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য সংযুক্ত মাসআলাটি দেখুন।
দলীলসমূহ:
1.
আয়াতঃ یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَاۡکُلُوۡۤا اَمۡوَالَکُمۡ بَیۡنَکُمۡ بِالۡبَاطِلِ اِلَّاۤ اَنۡ تَکُوۡنَ تِجَارَۃً عَنۡ تَرَاضٍ مِّنۡکُمۡ ۟ وَلَا تَقۡتُلُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ بِکُمۡ رَحِیۡمًا
অর্থঃ হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরে একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না, তবে পারস্পরিক সন্তুষ্টিক্রমে কোন ব্যবসায় করা হলে (তা জায়েয)। এবং তোমরা নিজেরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই, আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। সূরাঃ আন নিসা - আয়াত নংঃ 29
2.
আয়াতঃ اَلَّذِیۡنَ یَاۡکُلُوۡنَ الرِّبٰوا لَا یَقُوۡمُوۡنَ اِلَّا کَمَا یَقُوۡمُ الَّذِیۡ یَتَخَبَّطُہُ الشَّیۡطٰنُ مِنَ الۡمَسِّ ؕ ذٰلِکَ بِاَنَّہُمۡ قَالُوۡۤا اِنَّمَا الۡبَیۡعُ مِثۡلُ الرِّبٰوا ۘ وَاَحَلَّ اللّٰہُ الۡبَیۡعَ وَحَرَّمَ الرِّبٰوا ؕ فَمَنۡ جَآءَہٗ مَوۡعِظَۃٌ مِّنۡ رَّبِّہٖ فَانۡتَہٰی فَلَہٗ مَا سَلَفَ ؕ وَاَمۡرُہٗۤ اِلَی اللّٰہِ ؕ وَمَنۡ عَادَ فَاُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ
অর্থঃ যারা সুদ খায়, (কিয়ামতের দিন) তারা সেই ব্যক্তির মত উঠবে, শয়তান যাকে স্পর্শ দ্বারা পাগল বানিয়ে দিয়েছে। এটা এজন্য হবে যে, তারা বলেছিল, ‘ব্যবসাও তো সুদেরই মত। অথচ আল্লাহ বিক্রিকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তির নিকট তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে উপদেশ-বাণী এসে গেছে, সে যদি (সুদী কারবার হতে) নিবৃত্ত হয়, তবে অতীতে যা-কিছু হয়েছে তা তারই। আর তার (অভ্যন্তরীণ অবস্থার) ব্যাপার আল্লাহর এখতিয়ারে। আর যে ব্যক্তি পুনরায় (সে কাজই) করল, তো এরূপ লোক জাহান্নামী হবে। তারা তাতেই সর্বদা থাকবে। সূরাঃ আল বাকারা - আয়াত নংঃ 275
3.
আয়াতঃ وَتَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡبِرِّ وَالتَّقۡوٰی ۪ وَلَا تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡاِثۡمِ وَالۡعُدۡوَانِ ۪ وَاتَّقُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ
অর্থঃ তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অন্যকে সহযোগিতা করবে। গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহযোগিতা করবে না। আল্লাহকে ভয় করে চলো। নিশ্চয়ই আল্লাহর শাস্তি অতি কঠিন। সূরাঃ আল মায়িদাহ - আয়াত নংঃ 2
4.
আয়াতঃ اِنَّ الَّذِیۡنَ یُحِبُّوۡنَ اَنۡ تَشِیۡعَ الۡفَاحِشَۃُ فِی الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ۙ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ؕ وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ وَاَنۡتُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ
অর্থঃ স্মরণ রেখ, যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার হোক এটা কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে আছে যন্ত্রণাময় শাস্তি এবং আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না। সূরাঃ আন নূর - আয়াত নংঃ 19
5.
আয়াতঃ یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَوۡفُوۡا بِالۡعُقُوۡدِ ۬ؕ
অর্থঃ হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকার পূরণ করো। সূরাঃ আল মায়িদাহ - আয়াত নংঃ 1
6.
حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ هَارُونَ، أَخْبَرَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ، عَنْ حَمَّادٍ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ، عَنِ الأَسْوَدِ، عَنْ عَائِشَةَ، رضى الله عنها أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ " رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلاَثَةٍ عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ وَعَنِ الْمُبْتَلَى حَتَّى يَبْرَأَ وَعَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَكْبَرَ " .
৪৩৪৬. উছমান ইবনে আবু শায়রা (রাহঃ) .... আয়িশা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ তিন ব্যক্তি হতে কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে (অর্থাৎ যাদের ভাল-মন্দ আমল লেখা হয় না)। এরা হলোঃ
(১) নিদ্রিত ব্যক্তি- যতক্ষণ না সে জাগরিত হয়।
(২) পাগল ব্যক্তি- যতক্ষণ না সুস্থ হয় এবং
(৩) নাবালক ছেলে মেয়ে- যতক্ষণ না তারা বয়োঃপ্রাপ্ত হয়।
সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নংঃ ৪৩৪৬, আন্তর্জাতিক নং: ৪৩৯৮
التخريج : أخرجه أبو داود (4398) بنحوه، والنسائي (3432)، وابن ماجة (2041) باختلاف يسير، وأحمد (25114) واللفظ له
7.
وَحَدَّثَنِي يَحْيَى بْنُ أَيُّوبَ، وَقُتَيْبَةُ، وَابْنُ، حُجْرٍ جَمِيعًا عَنْ إِسْمَاعِيلَ بْنِ جَعْفَرٍ، - قَالَ ابْنُ أَيُّوبَ حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ، - قَالَ أَخْبَرَنِي الْعَلاَءُ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، . أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَرَّ عَلَى صُبْرَةِ طَعَامٍ فَأَدْخَلَ يَدَهُ فِيهَا فَنَالَتْ أَصَابِعُهُ بَلَلاً فَقَالَ " مَا هَذَا يَا صَاحِبَ الطَّعَامِ " . قَالَ أَصَابَتْهُ السَّمَاءُ يَا رَسُولَ اللَّهِ . قَالَ " أَفَلاَ جَعَلْتَهُ فَوْقَ الطَّعَامِ كَىْ يَرَاهُ النَّاسُ مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّي " .
১৮৬। ইয়াহয়া ইবনে আইয়ুব, কুতায়বা ও ইবনে হুজর (রাহঃ) ......... আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্তূপীকৃত খাদ্যশস্যের পাশ দিয়া যাচ্ছিলেন। তখন তিনি স্তূপের মধ্যে হাত ঢুকালেন। তাঁর হাতের আঙ্গুলগুলো আদ্র দেখতে পান। তিনি বললেনঃ হে খাদ্যশস্যের মালিক! এটা কি? সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! এতে বৃষ্টি পড়েছিল। রাসুল বললেনঃ কেন তুমি ভিজা অংশ খাদ্যশস্যের উপরে রাখনি, যাতে লোকেরা তা দেখতে পায়। যে ব্যক্তি ধোকা দেয় সে আমার দলভুক্ত নয়।
সহীহ মুসলিম, হাদীস নংঃ ১৮৬, আন্তর্জাতিক নং: ১০২
8.
حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، حَدَّثَنَا أَبُو عَوَانَةَ، عَنْ أَبِي بِشْرٍ، عَنْ يُوسُفَ بْنِ مَاهَكَ، عَنْ حَكِيمِ بْنِ حِزَامٍ، قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ يَأْتِينِي الرَّجُلُ فَيُرِيدُ مِنِّي الْبَيْعَ لَيْسَ عِنْدِي أَفَأَبْتَاعُهُ لَهُ مِنَ السُّوقِ فَقَالَ " لاَ تَبِعْ مَا لَيْسَ عِنْدَكَ " .
৩৪৬৭. মুসাদ্দাদ (রাহঃ) .... হাকীম ইবনে হিযাম (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। একদা তিনি বলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি কেউ আমার কাছে উপস্থিত হয়ে এমন কিছু জিনিস ক্রয় করতে চায়, যা আমার কাছে নেই, তবে কি আমি তাকে সে জিনিস বাজার থেকে ক্রয় করে দিতে পারি? তখন তিনি বলেনঃ তোমার কাছে যা নেই, তা তুমি ক্রয়-বিক্রয় করবে না।
সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নংঃ ৩৪৬৭, আন্তর্জাতিক নং: ৩৫০৩
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারা ৷
রেফারেন্স উত্তর :
প্রশ্নঃ ১৩১০৯. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমার একটা প্রশ্ন আছে।প্রশ্নটি হলো,আমার একটা ইউটিউব চ্যানেলের আছে। আমি সেখানে ওয়াজ, গজল ইসলামিক ভিডিও ছাড়ি।তাহলে কি আমার ওখান থেকে টাকা ইনকাম করা হালাল হবে।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
ইসলামী শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, যে ধরনের ভিডিও দেখা নিষিদ্ধ, সে সমস্ত ভিডিও ইন্টারনেটে বা ইউটিউবে আপলোড করা, তা থেকে অর্থ উপার্জন করা এবং রিওয়ার্ড হিসেবে ইউটিউবের 'প্লে বাটন' গ্রহণ করা—এর কোনোটিই বৈধ নয়। অন্যায় কাজ নিজে করা যেমন পাপ, অন্যকে সেই কাজে সহযোগিতা করাও সমভাবে নিষিদ্ধ।
তাই নাজায়েজ বা নিষিদ্ধ ভিডিও আপলোড করে ইউটিউব থেকে পুরস্কার হিসেবে প্লে বাটন নেওয়া সম্পূর্ণরূপে অবৈধ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
"তোমরা সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যকে সাহায্য করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা কঠোর শাস্তিদাতা।" {সূরা মায়িদা, আয়াত: ২}
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
الْمُسْلِمُونَ عَلَى شُرُوطِهِمْ
"মুসলমানগণ তাদের (পরস্পরের বৈধ) শর্তের ওপর অবিচল থাকবে।" {সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৯৪, সুনানে দারা কুতনী: ২৮৯০, শুআবুল ঈমান: ৪০৩৯}
অতএব, শরীয়তের সীমারেখার ভেতরে থেকে যেসব ভিডিও দেখা ও প্রচার করা জায়েজ, শুধুমাত্র সেই ধরনের ভিডিও আপলোড করে প্লে বাটন অর্জন করা বৈধ হবে।
ইউটিউব থেকে অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে শর্তাবলী:
ভিডিওর বিষয়বস্তু যদি সম্পূর্ণ জায়েজ হয়, তবে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে ইউটিউব থেকে আয় করা বৈধ হতে পারে। আমাদের বুঝতে হবে যে, গুগল এডসেন্সের (Google AdSense) মাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানি অর্থের বিনিময়ে তাদের বিজ্ঞাপন ইউটিউব ভিডিওতে প্রদর্শন করে এবং সেই আয়ের একটি অংশ ভিডিও ক্রিয়েটরদের দেওয়া হয়।
যদি বিজ্ঞাপনে প্রদর্শিত পণ্য বা বিষয়বস্তু হারাম, অশ্লীল কিংবা শরীয়ত বিরোধী হয়, তবে সেই বিজ্ঞাপন থেকে অর্জিত আয় হালাল হবে না। কারণ এটি হারামের প্রচার এবং পাপের কাজে পরোক্ষ সহযোগিতার শামিল। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন:
إِنَّ الَّذِيْنَ يُحِبُّوْنَ أَنْ تَشِيْعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِيْنَ آمَنُوْا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيْمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
"যারা মুমিনদের মাঝে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, নিশ্চয়ই তাদের জন্য ইহকাল ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে।" {সূরা নূর, আয়াত: ১৯}
পার্থিব ও দ্বীনি কল্যাণের স্বার্থে সন্দেহজনক বিষয় থেকেও বেঁচে থাকা জরুরি।
হযরত নোমান ইবনে বশির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
إِنَّ الْحَلاَلَ بَيِّنٌ وَإِنَّ الْحَرَامَ بَيِّنٌ وَبَيْنَهُمَا مُشْتَبِهَاتٌ لاَ يَعْلَمُهُنَّ كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ فَمَنِ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ وَعِرْضِهِ وَمَنْ وَقَعَ فِي الشُّبُهَاتِ وَقَعَ فِي الْحَرَامِ كَالرَّاعِي يَرْعَى حَوْلَ الْحِمَى يُوشِكُ أَنْ يَرْتَعَ فِيهِ أَلاَ وَإِنَّ لِكُلِّ مَلِكٍ حِمًى أَلاَ وَإِنَّ حِمَى اللَّهِ مَحَارِمُهُ أَلاَ وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ أَلاَ وَهِيَ الْقَلْبُ "
(নিশ্চয়ই) হালাল সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট আর এ উভয়ের মাঝে রয়েছে বহু সন্দেহজনক বিষয়, অনেক লোকই সেগুলো জানে না। যে ব্যক্তি এ সব সন্দেহজনক বিষয় থেকে দুরে থাকে সে তার দ্বীন ও মর্যাদাকে নিরাপদে রাখে, আর যে লোক সন্দেহজনক বিষয়ে পতিত হবে সে হারামের মধ্যে লিপ্ত হয়ে পড়বে। যেমন কোন রাখাল সংরক্ষিত (সরকারী) চারণভূমির আশপাশে পশু চরায়, আশঙ্কা রয়েছে সে পশু তার অভ্যন্তরে গিয়ে ঘাস খাবে। সাবধান! প্রত্যেক বাদশাহরই সংরক্ষিত এলাকা থাকে, সাবধান! আল্লাহর সংরক্ষিত এলাকা হল তার হারামকৃত বিষয়সমূহ। জেনে রাখো, দেহের মধ্যে এক টুকরা গোশত আছে। যখন তা সুস্থ থাকে তখন সমস্ত শরীরই সুস্থ থাকে। আর যখন তা নষ্ট হয়ে যায় তখন সমস্ত শরীরই নষ্ট হয়ে যায়। স্মরণ রেখো, তা হল ’ক্বলব’ (হৃদয়)। " {সহীহ মুসলিম: ১৫৯৯} https://muslimbangla.com/hadith/10998
সারকথা:
ইউটিউব বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো স্পন্সরশিপ বা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অর্থ আয়ের ক্ষেত্রে যদি সংশ্লিষ্ট কোম্পানির পণ্য, সেবা এবং ভিডিওর উপস্থাপন পদ্ধতি সম্পূর্ণ শরীয়তসম্মত হয়, তবেই সেই আয় জায়েজ হবে; অন্যথায় তা অবৈধ হবে। তবে এই ধরনের আয়ের ক্ষেত্রে যেহেতু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে থাকে না এবং হারামের মিশ্রণ ঘটার প্রবল আশঙ্কা থাকে, তাই সতর্কতা অবলম্বন করে এ জাতীয় সন্দেহজনক উপার্জন থেকে দূরে থাকাই একজন মুমিনের জন্য উত্তম ও নিরাপদ।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
বাইতুল কুরআন মাদারাসা , মোহাম্মাদপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন