কুরআন আল্লাহর বাণী হওয়ার প্রমাণ
প্রশ্নঃ ১৭১৬৫৪. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, কুরআন যে আল্লাহর বাণী, এতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই—এর প্রমাণ কী? নবীজি ﷺ বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি অনেক কষ্টে জীবন অতিবাহিত করেছেন। কুরআনে অনেক ভবিষ্যদ্বাণীও রয়েছে। এসব যুক্তি দেওয়া হয় কুরআন আল্লাহর বাণী প্রমাণ করার জন্য। কিন্তু এমনও তো হতে পারে, যত প্রমাণই থাকুক, যত অলৌকিকই হোক, কুরআন কোনো মানুষের বাণী—এমন হওয়ার সম্ভাবনা কি একেবারেই নেই? ০.১ শতাংশও কি সন্দেহ নেই? প্রমাণ কী? কুরআন অনেকের মতে নবীজির মৃত্যুর পর সংকলিত হয়েছে। এতে পরিবর্তন বলে পাইছে?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রথম আলোচনা: কুরআন যে আল্লাহর বাণী, তার প্রমাণ কী?
ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, কুরআনুল কারিম আল্লাহ তাআলার বাণী, যা তিনি জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর ওপর নাজিল করেছেন। মুসলমানের কাছে এটি অকাট্য বিশ্বাস। তবে কেউ যদি এ বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি ও প্রমাণ জানতে চান, তাহলে তাঁর সামনে কুরআনের ভাষা ও বক্তব্য, নবীজি ﷺ-এর জীবন, কুরআনের চ্যালেঞ্জ, এর বিষয়বস্তুর সামঞ্জস্য এবং ওহি সংরক্ষণের ইতিহাস তুলে ধরা যায়।
১. কুরআনের ভাষা ও চ্যালেঞ্জ
কুরআন নিজেই তার ঐশী উৎসের পক্ষে একটি চ্যালেঞ্জ পেশ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِمَّا نَزَّلْنَا عَلَىٰ عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِنْ مِثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ﴾
আমি আমার বান্দার ওপর যা নাজিল করেছি, তা সম্পর্কে যদি তোমাদের সন্দেহ থাকে, তাহলে এর মতো একটি সূরা নিয়ে এসো এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সাহায্যকারীদের ডাকো, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ২৩)
আরও বলা হয়েছে,
ইসলামি আলেমগণ কুরআনের অনন্য ভাষাশৈলী, বক্তব্যের গভীরতা, বর্ণনাভঙ্গি এবং মানুষের চিন্তা ও জীবনে এর প্রভাবকে কুরআনের মুজিজার গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে আলোচনা করেছেন।
২. নবীজি ﷺ-এর সততা ও জীবনাচরণ
নবী মুহাম্মদ ﷺ নবুওয়াতের আগে থেকেই তাঁর সমাজে বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি নবুওয়াতের পর এমন একটি বার্তা প্রচার করেছেন, যার কারণে তাঁকে নির্যাতন, সামাজিক বয়কট, দেশত্যাগ এবং যুদ্ধের মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
তাঁর জীবন থেকে বোঝা যায়, তিনি দুনিয়াবি আরাম-আয়েশ ও ব্যক্তিগত স্বার্থকে নিজের দাওয়াতের মূল লক্ষ্য বানাননি। তাঁর সততা, ত্যাগ, ধৈর্য ও চারিত্রিক দৃঢ়তা তাঁর নবুওয়াতের দাবির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য।
তবে যুক্তির দিক থেকে শুধু কষ্ট সহ্য করা বা কোনো ব্যক্তির আন্তরিকতা প্রমাণ করলেই তাঁর প্রতিটি বক্তব্য ঐশী প্রমাণিত হয় না। কেউ আন্তরিক হয়েও ভুল করতে পারেন। তাই নবীজি ﷺ-এর সততা ও জীবনাচরণকে কুরআনের অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
৩. কুরআনের বক্তব্যের সামঞ্জস্য
﴿أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا﴾
৪. নবীজি ﷺ-কে সংশোধন করা হয়েছে, এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কুরআনে এমন কিছু আয়াত রয়েছে, যেখানে নবীজি ﷺ-কে সংশোধন বা সতর্ক করা হয়েছে। যেমন, সুরা আবাসার শুরুতে ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-এর ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। আরও রয়েছে বদরের বন্দিদের প্রসঙ্গ (সুরা আল-আনফাল, আয়াত :৬৭-৬৮)।
৫. কুরআনের ভবিষ্যদ্বাণী
কুরআনে এমন কিছু ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে, যেগুলো মুসলিম আলেমগণ এর ঐশী উৎসের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন। উদাহরণস্বরূপ, রোমানদের পরাজয়ের পর পুনরায় বিজয়ী হওয়ার সংবাদ এসেছে সুরা আর-রূমের ২-৪ নম্বর আয়াতে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿غُلِبَتِ الرُّومُ فِي أَدْنَى الْأَرْضِ وَهُمْ مِنْ بَعْدِ غَلَبِهِمْ سَيَغْلِبُونَ فِي بِضْعِ سِنِينَ﴾
রোমানরা পরাজিত হয়েছে নিকটবর্তী অঞ্চলে; কিন্তু তাদের পরাজয়ের পর তারা অচিরেই বিজয়ী হবে, কয়েক বছরের মধ্যে। (সুরা আর-রূম, আয়াত :২-৪)মুসলিম ঐতিহ্যে এই আয়াতকে রোমানদের পরবর্তী বিজয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়। এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সময়সীমা যাচাই করে বিষয়টি আলোচনা করা যায়।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, কোনো ভবিষ্যদ্বাণীকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনের সময় তার সঠিক অর্থ, অবতরণের সময়, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং পরবর্তী ঘটনার সঙ্গে তার সম্পর্ক যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। শুধু ভবিষ্যদ্বাণী আছে বললেই সব প্রশ্নের উত্তর হয়ে যায় না; বরং এটি বৃহত্তর প্রমাণসমষ্টির একটি অংশ।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতি ও মুহাদ্দিস, জামিয়া বাবুস সালাম, বিমানবন্দর ঢাকা
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন