وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَاحْذَرُوا ۚ فَإِن تَوَلَّيْتُمْ فَاعْلَمُوا أَنَّمَا عَلَىٰ رَسُولِنَا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ
অনুবাদ
তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো ও রাসূলের আনুগত্য করো এবং (অবাধ্যতা) পরিহার করে চলো। তোমরা যদি (এ আদেশ থেকে) বিমুখ হও, তবে জেনে রেখ, আমার রাসূলের দায়িত্ব কেবল সুস্পষ্টরূপে (আল্লাহর হুকুম) প্রচার করা।
সুরা আল মায়িদাহ, আয়াত নং: ৯২
তাফসীর
এর সারমর্ম এই যে, আল্লাহ্ তা’আলা ও রাসূলের আনুগত্যের নির্দেশ তোমাদেরই উপকারার্থ দেওয়া হয়েছে। যদি তোমরা অমান্য কর, তবে তাতে আল্লাহ্ তা’আলার কোন ক্ষতি নেই এবং তাঁর রাসূলেরও কোন অনিষ্ট হবে না। আল্লাহ্ তা’আলা যে লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে, তা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না। রাসূল সম্পর্কে এরূপ ধারণা হতে পারত যে, তাঁর আদেশ পালিত না হলে সম্ভবত তাঁর সওয়াব ও মর্তবা হ্রাস পাবে। এ ধারণা নিরসনের জন্য বলা হয়েছেঃ
فَإِنْ تَوَلَّيْتُمْ فَإِنَّمَا عَلَى رَسُولِنَا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ
অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে কেউ যদি রাসূলের আদেশ পালন না করে, তবে তাতে তাঁর মর্তবা হ্রাস পাবে না। কারণ তাঁকে যে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল, তা তিনি সম্পন্ন করেছেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল খোলাখুলিভাবে আল্লাহ্ তা’আলার নির্দেশাবলী পৌছিয়ে দেওয়া। এরপর কেউ না মানলে সে তার নিজেরই ক্ষতি করে। আমার রাসূলের এতে কিছুই যায় আসে না।
তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন।
حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ حَنْبَلٍ، حَدَّثَنَا الْوَلِيدُ بْنُ مُسْلِمٍ، حَدَّثَنَا ثَوْرُ بْنُ يَزِيدَ، قَالَ حَدَّثَنِي خَالِدُ بْنُ مَعْدَانَ، قَالَ حَدَّثَنِي عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ عَمْرٍو السُّلَمِيُّ، وَحُجْرُ بْنُ حُجْرٍ، قَالاَ أَتَيْنَا الْعِرْبَاضَ بْنَ سَارِيَةَ وَهُوَ مِمَّنْ نَزَلَ فِيهِ ( وَلاَ عَلَى الَّذِينَ إِذَا مَا أَتَوْكَ لِتَحْمِلَهُمْ قُلْتَ لاَ أَجِدُ مَا أَحْمِلُكُمْ عَلَيْهِ ) فَسَلَّمْنَا وَقُلْنَا أَتَيْنَاكَ زَائِرِينَ وَعَائِدِينَ وَمُقْتَبِسِينَ . فَقَالَ الْعِرْبَاضُ صَلَّى بِنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ذَاتَ يَوْمٍ ثُمَّ أَقْبَلَ عَلَيْنَا فَوَعَظَنَا مَوْعِظَةً بَلِيغَةً ذَرَفَتْ مِنْهَا الْعُيُونُ وَوَجِلَتْ مِنْهَا الْقُلُوبُ فَقَالَ قَائِلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ كَأَنَّ هَذِهِ مَوْعِظَةُ مُوَدِّعٍ فَمَاذَا تَعْهَدُ إِلَيْنَا فَقَالَ " أُوصِيكُمْ بِتَقْوَى اللَّهِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَإِنْ عَبْدًا حَبَشِيًّا فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ بَعْدِي فَسَيَرَى اخْتِلاَفًا كَثِيرًا فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّينَ الرَّاشِدِينَ تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ " .
অনুবাদ
হাজার ইবনে হাজার (রাহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা ইরবায ইবনে সারিয়া (রা.)-এর নিকট গমন করি, যার শানে এ আয়াত নাযিল হয়: “তাদের জন্য কোনো অসুবিধা নেই, যারা আপনার নিকট এ জন্য আসে যে, আপনি তাদের জন্য বাহনের ব্যবস্থা করবেন। আপনি বলেন, আমি তো তোমাদের জন্য কোনো বাহন পাই না।”
রাবি বলেন, আমরা তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে তাঁকে সালাম করি এবং বলি, আমরা আপনাকে দেখার জন্য, আপনার খিদমতের জন্য এবং আপনার কাছ থেকে কিছু সংগ্রহের জন্য এসেছি। তখন তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের সঙ্গে নামায আদায়ের পর আমাদের দিকে ফিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন, যাতে আমাদের চোখ অশ্রুসিক্ত হয় এবং অন্তর ভীত-সন্ত্রস্ত হয়। আমাদের মধ্যে একজন বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মনে হচ্ছে, এ আপনার বিদায়ী ভাষণ। কাজেই আপনি আমাদের আরও কিছু ওসিয়ত করুন।
তখন তিনি বলেন, আমি তোমাদের তাকওয়া অবলম্বনের জন্য বলছি এবং শোনা ও মানার জন্যও, যদিও তোমাদের আমির হাবশি গোলাম হয়। কেননা, তোমাদের মধ্যে যারা আমার পরে জীবিত থাকবে, তারা বহু মতভেদ দেখতে পাবে। এমতাবস্থায় তোমাদের উচিত হবে আমার ও আমার খুলাফায়ে রাশেদার সুন্নতের অনুসরণ করা, যারা সত্য ও ন্যায়ের অনুসারী। তোমরা তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে। তোমরা বিদআতের অনুসরণ ও অনুকরণ করা থেকে দূরে থাকবে। কেননা, প্রত্যেক নতুন কথাই বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআতই গোমরাহি।
সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪৫৫২
ব্যাখ্যা
হযরত ইরবায ইবনে সারিয়া রাযি. বর্ণনা করেন, একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী নসীহত করলেন। এতে সাহাবায়ে কেরামের অন্তর ভীত-বিগলিত হয় এবং চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। তাঁরা মনে করলেন, এটি যেন বিদায়ী নসীহত। তাই তাঁরা অসিয়ত চাইলে রাসূলুল্লাহ ﷺ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন।
১. তাকওয়া অবলম্বন করা। কারণ তাকওয়া মানুষের সকল আমলের প্রাণশক্তি এবং আল্লাহর আনুগত্য ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার মূল ভিত্তি।
২. আমীর ও শাসকের আনুগত্য করা। তবে আনুগত্য কেবল শরিয়তসম্মত কাজে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, «إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوفِ»—“আনুগত্য কেবল সৎ ও শরিয়তসম্মত কাজেই।”
৩. ভবিষ্যতে বহু মতভেদ দেখা দেবে। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নত এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নত দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে। তিনি বলেন, «فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ»—“তোমরা আমার সুন্নত ও হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নত আঁকড়ে ধরো।”
৪. সুন্নতকে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করতে হবে। বিভিন্ন মত ও মতবাদের সময়ে সুন্নতের অনুসরণই হিদায়াতের ওপর অটল থাকার মাধ্যম।
৫. দ্বীনের মধ্যে নব-উদ্ভাবিত বিষয় তথা বিদআত থেকে বেঁচে থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, «فَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ»—“নিশ্চয়ই প্রত্যেক বিদআত গোমরাহী।”
اللّٰهُمَّ إِيمَانًا بِكَ، وَتَصْدِيقًا بِكِتَابِكَ، وَوَفَاءً بِعَهْدِكَ، وَاتِّبَاعًا لِسُنَّةِ نَبِيِّكَ.
উচ্চারণ
আল্লাহুম্মা ঈমানাম বিকা, ওয়া তাসদীকাম বিকিতাবিকা, ওয়া ওয়াফা-আম বিআহদিকা, ওয়াত্তিবা‘আল লিসুন্নাতি নাবিয়্যিকা।
অনুবাদ
হে আল্লাহ! আপনার প্রতি ঈমান রেখে, আপনার কিতাবকে সত্য বলে বিশ্বাস করে, আপনার অঙ্গীকার পূরণ করে এবং আপনার নবীর সুন্নত অনুসরণ করে (আমি এ কাজ করছি)।
আত-তালখীসুল হাবীর, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.), খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৮৭৩।
ফজিলত / আমল
০
প্রশ্ন
অজুতে পা ধোয়ার সুন্নত পদ্ধতি কী?
উত্তর
পা ধোয়ার সুন্নত পদ্ধতি হলো—প্রথমে ডান পা, তারপর বাম পা ধোয়া। ধোয়ার সময় ডান হাতে পানি ঢালা এবং বাম হাত দিয়ে পা ভালোভাবে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করা উত্তম। যদি পানি ঢালার প্রয়োজন না থাকে, তাহলে শুধু বাম হাত দিয়েই উভয় পা ধোয়া উচিত।
উত্তর দিয়েছেনঃ নাঈম সিদ্দীকী বিন আব্দুস সাত্তার
শিক্ষক, হাদীস ও ফিকহ বিভাগ
মারকাযুশ শরীয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা
বিবরণ
আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ আমার উম্মতের জন্য বা তিনি বলেছেন, লোকদের জন্য যদি কঠিন মনে না করতাম, তা হলে প্রত্যেক নামাযের সাথে তাদের মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।
সহীহ বুখারী হাদীস নং: ৮৪৩
মাসিক আল কাউসার
বিস্তারিত
মানুষের মধ্যে ভালো ও মন্দের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টিকারী দুটি শক্তি রয়েছে। বিদআতের বাহ্যিক সৌন্দর্য মানুষকে আকৃষ্ট করে, ফলে অনেকে একে ভালো মনে করে মন্দ কাজে লিপ্ত হয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে বিদআত এমনভাবে ছড়িয়ে পড়বে, যেমন পাগলা কুকুরের বিষ দংশিত ব্যক্তির শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। (ইমাম আহমদ ও আবু দাউদ; মিশকাত, হাদীস ৩০)
বিদআত মানুষের ঈমান, আকীদা ও চিন্তাধারাকে বিকৃত করে। একসময় মানুষ বিদআতকেই শরিয়ত ও সুন্নাহ মনে করবে। এমনকি কেউ বিদআত ছেড়ে দিলে তাকে সুন্নাহ পরিত্যাগকারী বলে ধিক্কার দেবে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন, এমন সময় আসবে যখন বিদআত ছেড়ে দিলে মানুষ বলবে, তুমি সুন্নাহ ছেড়ে দিয়েছ। এ বিপর্যয় দেখা দেবে যখন হক্কানী আলেমগণ বিদায় নেবেন, মূর্খদের প্রাধান্য বাড়বে, প্রাজ্ঞ ফকীহের সংখ্যা কমবে এবং দ্বীনি ইলম দুনিয়া উপার্জনের উদ্দেশ্যে শিক্ষা করা হবে। (সুনানে দারেমী, ১/৬৪)
### বিদআত প্রতিরোধ ও সুন্নাহ প্রতিষ্ঠার আশার আলো
ইসলামে বিদআত ছড়িয়ে পড়লেও আল্লাহ তাআলা কিয়ামত পর্যন্ত এমন একটি দলকে অবশিষ্ট রাখবেন, যারা বিদআতের প্রতিরোধ ও সুন্নাহ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।
হযরত সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, “আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। শত্রুরা তাদের ক্ষতি করতে পারবে না। তারা আল্লাহর নির্দেশ আসা পর্যন্ত হকের ওপর অবিচল থাকবে।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৯৫০)