প্রবন্ধ
জীবনে বরকত ও রিজিক বৃদ্ধির সহজ পথ
১৭ অক্টোবর, ২০২৬
১২৫৩
০
মানুষের জীবন এক অবিরাম পথচলা। সকালের ঘুমভাঙা চোখ থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত, আমাদের প্রতিটি কাজের পেছনে একটি সহজ চাওয়া থাকে, একটু সচ্ছলতা, জীবনের একটু নিশ্চয়তা আর কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস। মানুষের এই স্বাভাবিক চাওয়াকে পবিত্র কুরআনও অস্বীকার করেনি। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি হলো পার্থিব জীবনের শোভা। (সূরা আল-কাহাফ: ৪৬)
কিন্তু এই পার্থিব প্রাচুর্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে আমরা প্রায়ই একটি চিরন্তন সত্য ভুলে যাই, রিজিক কেবল গায়ের ঘাম ঝরিয়ে কেনা কোনো জিনিস নয়। রিজিক হলো, আসমান থেকে নেমে আসা আল্লাহর অশেষ দয়া ও অনুগ্রহ। আমরা শুধু বাইরের চেষ্টা ও উপায়-উপকরণের পেছনে ছুটে বেড়াই। অথচ মহান আল্লাহ বস্তুগত চেষ্টার পাশাপাশি এমন কিছু আত্মিক ও সহজ পথ আমাদের জন্য খুলে রেখেছেন, যা দুনিয়ার জীবনে সচ্ছলতা আনে আর পরকালের পথকেও সহজ ও সুন্দর করে।
১. তাকওয়া: সংকটমুক্তির আসল পথ
কুরআনের পাতায় পাতায় যে গুণটির কথা সবচেয়ে বেশি বলা হয়েছে, তা হলো তাকওয়া। তাকওয়া মানে কোনো নিষ্ক্রিয় একাকিত্ব নয়, তাকওয়া হলো অন্তরে স্রষ্টার জীবন্ত উপস্থিতিকে প্রতিক্ষণ অনুভব করা এবং সব ধরনের অন্যায় থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা। এটি যেমন পাপ থেকে বাঁচার ঢাল, তেমনি পরকালের সর্বোত্তম পাথেয়। মহান রবের বাণী, তোমরা পাথেয় সংগ্রহ করো, নিশ্চয়ই সর্বোত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া। (সূরা আল-বাকারা: ১৯৭)
যে মানুষটি আল্লাহর ভালোবাসায় নিজের অন্যায় ইচ্ছেগুলোকে সংযত রাখতে শেখে, আসমানের রব তার সব সংকীর্ণ পথ প্রশস্ত করে দেন। পবিত্র কুরআনে পরিষ্কার প্রতিশ্রুতি এসেছে, ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে চলে, আল্লাহ তার জন্য সংকট থেকে উদ্ধারের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে ভাবতেও পারেনি। (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
২. ইস্তিগফার
মানুষ ভুলের সমষ্টি। এই ভুলের ভারী বোঝা যখন আত্মায় জমতে থাকে, তখন আসমানের অনুগ্রহের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। আর সেই বন্ধ দুয়ার খুলে দেওয়ার সবচেয়ে মধুর চাবি হলো ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা।
হজরত নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে নিরাশার আঁধার থেকে আশার আলো দেখিয়ে বলেছিলেন, তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে পর্যাপ্ত বৃষ্টি বর্ষণ করবেন; তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সমৃদ্ধি দেবেন এবং গড়ে তুলবেন সুন্দর বাগান ও বহমান নদীমালা। (সূরা নূহ: ১০-১২)
أَسْتَغْفِرُ اللهَ কিংবা رَبِّ اغْفِرْ لِي এর মতো ছোট দোয়ায় লুকিয়ে আছে অন্তহীন শক্তি। আর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার-এর ভাষায় বান্দা যখন নিজের সমস্ত ভুল স্বীকার করে রবের রহমতের কাছে নত হয়, তখন আরশের করুণা সেই বান্দার জীবনকে ক্ষমা ও প্রাচুর্যে ভরিয়ে দেয়।
৩. দোয়া ও হালাল জীবিকা
দোয়া হলো বান্দা আর তার সৃষ্টিকর্তার মধ্যকার সরাসরি হৃদয়ের আলাপ। মনের গভীর হাহাকার, ঋণের বোঝা আর দীর্ঘশ্বাস এক ফোঁটা অশ্রু হয়ে যখন সিজদায় গড়ায়, আসমানের মালিক তা কখনো শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত ফাতেমা (রা.)-কে অভাব দূর করার জন্য একটি মহিমান্বিত দোয়া শিখিয়েছিলেন, হে সপ্তাকাশের রব এবং মহিমান্বিত আরশের অধিপতি! আমাদের প্রতিপালক এবং প্রতিটি বস্তুর রব... আমাদের পক্ষ থেকে সমস্ত ঋণ শোধ করে দিন এবং দারিদ্র্য দূর করে আমাদের সচ্ছলতা দান করুন। (সহিহ মুসলিম: ২৭১৩)
তবে প্রার্থনার এই আর্তি তখনই কবুল হয়, যখন জীবনের প্রতিটি লোকমা হয় পূত-পবিত্র। রাসুলুল্লাহ (সা.) এক পথশ্রান্ত ব্যক্তির উপমা দিয়েছেন, যে আকাশের দিকে হাত তুলে কাতরভাবে ডাকছিল; অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে হারাম দিয়েই পরিপুষ্ট হয়েছে। এমন ব্যক্তির দোয়া কীভাবে কবুল হতে পারে?! তাই রবের কাছে রিজিক চাইতে হলে নিজের উপার্জনকে আগে হালালের স্বচ্ছ জলে পবিত্র করে নিতে হয়।
৪. তাসবিহ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টি অহর্নিশ তার রবের মহিমা প্রকাশ করছে। তরুলতা, পাখি কিংবা সাগরের জলরাশি—সবাই আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনায় রত।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
إِنَّ نَبِيَّ اللَّهِ نُوحًا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا حَضَرَتْهُ الْوَفَاةُ قَالَ لِابْنِهِ: إِنِّي قَاصٌّ عَلَيْكَ الْوَصِيَّةَ، آمُرُكَ بِاثْنَتَيْنِ، وَأَنْهَاكَ عَنْ اثْنَتَيْنِ، آمُرُكَ بِلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، فَإِنَّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعَ وَالْأَرَضِينَ السَّبْعَ لَوْ وُضِعَتْ فِي كِفَّةٍ، وَوُضِعَتْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ فِي كِفَّةٍ، رَجَحَتْ بِهِنَّ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَلَوْ أَنَّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعَ وَالْأَرَضِينَ السَّبْعَ كُنَّ حَلْقَةً مُبْهَمَةً قَصَمَتْهُنَّ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، فَإِنَّهَا صَلَاةُ كُلِّ شَيْءٍ، وَبِهَا يُرْزَقُ الْخَلْقُ.
নিশ্চয়ই আল্লাহর নবী নূহ (আ.) যখন তাঁর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলো, তখন তিনি তাঁর সন্তানকে বললেন: আমি তোমাকে দুটি বিষয়ের অসিয়ত করছি এবং দুটি বিষয় থেকে নিষেধ করছি। আমি তোমাকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করার নির্দেশ দিচ্ছি... আর ‘সবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি পাঠ করার নির্দেশ দিচ্ছি; কারণ এটি প্রত্যেক বস্তুর সালাত এবং এর মাধ্যমে সৃষ্টিজীবকে রিজিক দেওয়া হয়। (মুসনাদ আহমাদ: ৬৫৮৩; আল-আদাবুল মুফরাদ: ৫৪৮)
যে মুখ সর্বদা আল্লাহর শুকরিয়া ও প্রশংসায় মুখরিত থাকে, প্রকৃতি ও আসমানের রহমত স্বয়ং তার পাশে এসে দাঁড়ায়।
৫. তাওয়াক্কুল: সাধ্যমতো চেষ্টার পর আল্লাহর ওপর ভরসা
ভোরের আলো ফুটতেই পাখিরা নীড় ছেড়ে দিগন্তে ডানা মেলে দেয়। তাদের কোনো সঞ্চয় নেই, নেই কোনো শস্যভাণ্ডার। অথচ দিনশেষে যখন তারা ঘরে ফেরে, তাদের উদর থাকে পরম তৃপ্তিতে পরিপূর্ণ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে তাওয়াক্কুল বা ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদের পাখিদের মতো রিজিক দিতেন; যারা ভোরে ক্ষুধার্ত অবস্থায় বের হয় এবং সন্ধ্যায় তৃপ্ত পেটে নীড়ে ফিরে আসে। (সুনানে তিরমিজি: ২৩৪৪)
তাওয়াক্কুল মানে হাত গুটিয়ে অলস বসে থাকা নয়; বরং সাধ্যের সবটুকু চেষ্টা করার পর ফলাফলের ভার প্রশান্ত হৃদয়ে রবের হাতে সঁপে দেওয়া। যেখানে জাগতিক হিসেব থমকে দাঁড়ায়, সেখান থেকেই আল্লাহর কুদরতের অলৌকিক হিসেব শুরু হয়।
৬. চাশতের নামাজ
সূর্য যখন পূর্বাকাশে স্নিগ্ধ আলো ছড়ায়, তখন চার রাকাত চাশতের নামাজ আদায় করলে বান্দার সারা দিনের যাবতীয় প্রয়োজনের ভার স্বয়ং আল্লাহ নিজ জিম্মায় তুলে নেন। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
হে বনি আদম! দিনের শুরুতে আমার সন্তুষ্টির জন্য চার রাকাত নামাজ পড়ো, আমি তোমার সারা দিনের সমস্ত প্রয়োজনের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাব। (সুনানে তিরমিজি: ৪৭৫)
৭. বিবাহ
আজকের পৃথিবী যখন খরচ আর ক্ষুধার ভয়ে বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে দূরে থাকতে চায়, ইসলাম তখন বিয়ের শুভ পরিণয়ের ভেতর অভাবমুক্তির সমাধান নির্দেশ করেছে। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিবাহ করিয়ে দাও... তারা যদি অভাবগ্রস্তও হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের সচ্ছল করে দেবেন। (সূরা আন-নূর: ৩২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিন ব্যক্তিকে সাহায্য করা আল্লাহর জন্য অপরিহার্য দায়িত্ব; তার মধ্যে অন্যতম হলো সেই বিবাহপ্রার্থী, যে পবিত্র ও নিষ্কলুষ জীবনযাপনের উদ্দেশ্যে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চায়। (জামে তিরমিজি: ১৬৫৫)
৮. আত্মীয়তার সুসম্পর্ক ও মায়ার বন্ধন
মানুষ তখনই নিঃস্ব হয়ে পড়ে, যখন সে সম্পর্কের মায়া ছিন্ন করে একা হয়ে যায়। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) রক্তের সম্পর্কের ভেতর পার্থিব সমৃদ্ধির গোপন সূত্র বাতলে দিয়ে বলেছেন, যে ব্যক্তি কামনা করে যে তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ু দীর্ঘায়িত হোক, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখে। (সহিহ বুখারি: ২০৬৭)
৯. দান-সদকা
পার্থিব সাধারণ গণিতে দান করলে টাকা কমে যায়; কিন্তু আসমানি হিসেবে দান করলে তা বহুগুণ বেড়ে যায়। আল্লাহ তাআলা সুদকে ধ্বংস করেন আর দান-সদকাকে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করে দেন। (সূরা আল-বাকারা: ২৭৬)
সৎকর্মশীলদের এই দানকে কুরআনে এক চিরস্থায়ী ও অজেয় ব্যবসা বলা হয়েছে, যা কখনো লোকসানে পড়ে না। (সূরা ফাতির: ২৯-৩০) নদীর মতো যে হৃদয় অন্যের কল্যাণে নিজেকে উজাড় করে দিতে জানে, তার জীবনে আসমানের অফুরন্ত প্রাচুর্য এসে জমা হতে বাধ্য।
রিজিক কেবল ব্যাংকে জমানো কাগুজে নোট আর অট্টালিকার জাঁকজমকে সীমাবদ্ধ নয়। রিজিকের সবচেয়ে স্নিগ্ধ ও সুন্দর রূপটি হলো, অন্তরের তৃপ্তি, একটি সুস্থ শরীর, কল্যাণময় পরিবার আর সিজদায় অবনত হতে পারার অনাবিল প্রশান্তি।
জীবন যখন নানা অভাব ও উদ্বেগে দোলায়িত হয়, তখন কেবল বস্তুগত চেষ্টার পেছনে অন্ধভাবে না ছুটে তাকওয়া, তওবা, তাওয়াক্কুল আর সদকার এই আত্মিক পথগুলোতে আমাদের ফিরে আসতে হবে। তবেই পার্থিব জীবনে ধরা দেবে আসমানি প্রশান্তির স্নিগ্ধ ছায়া, আর পরকালেও অর্জিত হবে জান্নাতুল ফিরদাউসের চিরন্তন নেয়ামত।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
তিনটি বড় গুনাহ- বদযবানী, বদনেগাহী, বদগুমানী
মুরাদাবাদ। একটি প্রসিদ্ধ শহর। ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি জেলা। এ শহরেই অবস্থিত প্রসিদ্ধ একটি মাদরাসা...
'সঙ্গ গুণে রঙ্গ ধরে'
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর... বুযুর্গানে মুহতারাম, আমরা সবাই দীন অর্জন করতে আগ্র...
তাকওয়া হাসিলের উপায়
‘ইসলাহে নফস’ বা আত্মশুদ্ধির বিষয়ে কিছু কথা আপনাদের খিদমতে পেশ করতে আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্র...
‘এ দাওয়াত ও তাবলীগের উদ্দেশ্য হচ্ছে দ্বীনের তলব পয়দা করা’
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন