জ্বীনের আসর ও বান কাকে বলে?
১. জ্বিনের আসর বলতে সাধারণত এমন অবস্থাকে বোঝানো হয়, যেখানে কোনো জ্বিন আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করে বা তাকে কষ্ট দেয়। ইসলামী পরিভাষায় একে صرع الجن (জ্বিনের কারণে আক্রান্ত হওয়া) বা مس الجن (জ্বিনের স্পর্শ) বলা হয়। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত যে, জ্বিন মানুষের ওপর কিছু ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اَلَّذِیۡنَ یَاۡکُلُوۡنَ الرِّبٰوا لَا یَقُوۡمُوۡنَ اِلَّا کَمَا یَقُوۡمُ الَّذِیۡ یَتَخَبَّطُہُ الشَّیۡطٰنُ مِنَ الۡمَسِّ যারা সুদ খায়, (কিয়ামতের দিন) তারা সেই ব্যক্তির মত উঠবে, শয়তান যাকে স্পর্শ দ্বারা পাগল বানিয়ে দিয়েছে। বাকারা, ২৭৫। ২. বান কী? 'বান' শব্দটি কুরআন-হাদীস বা প্রাচীন ফিকহের পরিভাষা নয়; এটি বাংলা সমাজে প্রচলিত একটি লোকজ শব্দ। সাধারণত কারও ক্ষতি, বিচ্ছেদ, অসুস্থতা বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে জাদু (السحر) করা হলে মানুষ তাকে "বান মারা" বলে থাকে। অর্থাৎ শরয়ী দৃষ্টিতে 'বান' বলতে স্বতন্ত্র কোনো বিষয় নয়; বরং এটি জাদুরই একটি প্রচলিত নাম বা ধরন। فَیَتَعَلَّمُوۡنَ مِنۡہُمَا مَا یُفَرِّقُوۡنَ بِہٖ بَیۡنَ الۡمَرۡءِ وَزَوۡجِہٖ তারা তাদের থেকে এমন জিনিস শিক্ষা করত, যা দ্বারা তারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত সুরা বাকারা, আয়াত ১০২। তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন: হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালামের আমলে কিছু শয়তান, যাদের মধ্যে জিন ও মানুষ উভয়ই থাকতে পারে, কতক ইয়াহুদীকে ফুসলানি দিল যে, হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালামের রাজত্বের (খৃস্টপূর্ব ৯৯০-৯৩০) সকল রহস্য যাদুর মধ্যে নিহিত। তোমরা যদি যাদু শিক্ষা কর, তবে তোমাদেরও বিস্ময়কর ক্ষমতা অর্জিত হবে। সুতরাং তারা যাদুর তালীম নিতে ও তা কাজে লাগাতে শুরু করে দিল। অথচ যাদু শেখা যে কেবল অবৈধ ছিল তাই নয়, বরং তার কোনও কোনও পদ্ধতি ছিল কুফরী পর্যায়ের। ইয়াহুদীরা দ্বিতীয় মহাপাপ করেছিল এই যে, তারা খোদ হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালামকেই একজন যাদুকর সাব্যস্ত করেছিল এবং তাঁর সম্পর্কে প্রচার করেছিল, তিনি শেষ জীবনে মূর্তিপূজা শুরু করে দিয়েছিলেন। তাঁর সম্পর্কে এসব অপবাদমূলক কাহিনী তারা তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহেও জুড়ে দিয়েছিল, যা বাইবেলে আজও পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যায়। বাইবেলে এখনও পর্যন্ত তাঁর মুরতাদ হওয়ার বিবরণ বিদ্যমান (দ্র. ১-বাদশানামা ১১:১-২১)। নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক। কুরআন মাজীদের এ আয়াতে হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালামের প্রতি আরোপিত এ ন্যাক্কারজনক অপবাদকে খণ্ডন করা হয়েছে। এর দ্বারা আরও পরিষ্কার হয়ে যায়, কুরআন মাজীদ সম্পর্কে যারা অপবাদ দিত যে, ‘এটা ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের কিতাব থেকে আহরিত’, তাদের সে অপবাদ কতটা মিথ্যা! এ স্থলে কুরআন মাজীদ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ইয়াহুদী ও নাসারাদের কিতাবসমূহকে রদ করছে। সত্য কথা হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এমন কোনও মাধ্যম ছিল না, যা দ্বারা তিনি নিজে ইয়াহুদীদের কিতাবে কী লেখা আছে তা জেনে নেবেন। এটা জানার জন্য তাঁর কাছে কেবল ওহীরই সূত্র ছিল। সুতরাং এ আয়াত তাঁর ওহীপ্রাপ্ত নবী হওয়ার সুস্পষ্ট দলীল। এর দ্বারা তিনি ইয়াহুদীদের কিতাবে হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালামের প্রতি কি ধরনের অপবাদ আরোপ করা হয়েছে সে কথা জানিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং অতি দৃঢ়তার সাথে তা খণ্ডনও করেছেন।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: সব অসুস্থতা, মানসিক সমস্যা বা অস্বাভাবিক আচরণকে জ্বিনের আসর বা জাদু/বান বলে ধরে নেওয়া শরিয়তসম্মত নয়। অনেক রোগের শারীরিক, মানসিক বা স্নায়বিক কারণ থাকে। তাই প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পাশাপাশি শরয়ী রুকইয়াহ করা উচিত। জ্বিন, জাদু বা বদনজরের ব্যাপারে অতিরঞ্জন, কুসংস্কার এবং ভিত্তিহীন দাবি থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
দু'আর বিষয়সমূহ
38টি বিষয় পাওয়া গেছে