ফজরের ওয়াক্ত, নামাযের উত্তম সময় ও রমযানে আগে আদায়ের বিধান
প্রশ্নঃ ১৪৫৬৩৮. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, ফজরের ওয়াক্ত কখন শুরু ও শেষ হয় এবং নামায আদায়ের উত্তম সময় কোনটি? বিশেষত, রমযান মাসে অন্যান্য মাসের তুলনায় ফজরের নামায আগে আদায় করা কি উত্তম? দলীলসহ জানতে চাই। হাওয়ালা সহ জানতে চাই।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
ফজরের ওয়াক্ত কখন শুরু হয় এবং কখন শেষ হয়?
ফজরের নামাযের ওয়াক্ত শুরু হয় সুবহে সাদিক থেকে। অর্থাৎ, রাতের অন্ধকারের পর পূর্ব আকাশে আলো আড়াআড়িভাবে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়। আর সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ফজরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যায়। তাই ফজরের নামায সূর্যোদয়ের আগেই আদায় করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ
তোমরা পানাহার করতে থাকো, যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। (সুরা আল-বাকারা, আয়াত:১৮৭)
এ আয়াতে সুবহে সাদিকের কথা বলা হয়েছে। ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর থেকে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত যেকোনো সময় নামায আদায় করলে তা সময়ের মধ্যে আদায় হবে। তবে ওয়াক্তের মধ্যে নামায আদায় করা আর কোন সময়ে আদায় করা উত্তম, এ দুটি আলাদা বিষয়।
সাধারণ সময়ে ফজরের নামায দেরিতে পড়ার বিধান
হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, সাধারণ অবস্থায় ফজরের নামায কিছুটা আলো প্রকাশ পাওয়ার পর আদায় করা উত্তম। ফিকহের পরিভাষায় একে ‘ইসফার’ বলা হয়।
হযরত রাফি‘ ইবনে খাদীজ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন-
أَسْفِرُوا بِالْفَجْرِ، فَإِنَّهُ أَعْظَمُ لِلْأَجْرِ.
তোমরা ফজরের নামায কিছুটা আলো প্রকাশ পাওয়ার সময় আদায় করো; কেননা এতে অধিক সওয়াব রয়েছে।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ৪২৪; জামে তিরমিযী, হাদীস: ১৫৪)
এ হাদীসের ভিত্তিতে হানাফি ফকীহগণ সাধারণ অবস্থায় ফজরের নামায কিছুটা আলো প্রকাশ পাওয়ার পর আদায় করাকে উত্তম বলেছেন। তবে এত দেরি করা যাবে না, যাতে সূর্যোদয়ের আগে নামায শেষ করতে অসুবিধা হয় বা ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
রমযান মাসে ফজরের জামাত আগে পড়ার বিধান
রমযান মাসে সাহরির কারণে মানুষ রাতেই জেগে থাকে। এ সময় ফজরের জামাত কিছুটা আগে হলে মুসল্লিদের জন্য সুবিধা হতে পারে। এ ছাড়া রমযানে অন্ধকার থাকতেই ফজরের নামায আদায় করার পক্ষে হানাফি ফকীহদের বক্তব্যও রয়েছে।
হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) থেকে বর্ণিত,
تَسَحَّرْنَا مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم، ثُمَّ قَامَ إِلَى الصَّلَاةِ. قُلْتُ: كَمْ كَانَ بَيْنَ الْأَذَانِ وَالسَّحُورِ؟ قَالَ: قَدْرُ خَمْسِينَ آيَةً.
আমরা নবী ﷺ-এর সঙ্গে সাহরি খেলাম। এরপর তিনি নামাযের জন্য দাঁড়ালেন। জিজ্ঞাসা করা হলো, সাহরি ও নামাযের মধ্যবর্তী সময় কতটুকু ছিল? তিনি বললেন, পঞ্চাশ আয়াত তিলাওয়াত করার মতো সময়। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ১৯২১; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০৯৭)
এ হাদীস থেকে বোঝা যায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহরির পর বেশি দেরি না করে ফজরের নামাযে দাঁড়াতেন। তবে হাদীসটি সরাসরি এ কথা বলে না যে, তিনি প্রত্যেক রমযানে ফজরের নামায একেবারে ওয়াক্তের শুরুতেই আদায় করতেন।
আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.) ফয়যুল বারী গ্রন্থে লিখেছেন,
وَلَعَلَّ هَذَا التَّغْلِيسَ كَانَ فِي رَمَضَانَ خَاصَّةً، وَهَكَذَا يَنْبَغِي عِنْدَنَا إِذَا اجْتَمَعَ النَّاسُ، وَعَلَيْهِ الْعَمَلُ فِي دَارِ الْعُلُومِ بِدِيُوبَنْدَ مِنْ عَهْدِ الْأَكَابِرِ.
অর্থ: “সম্ভবত এই অন্ধকার থাকতে নামায আদায় করা বিশেষভাবে রমযান মাসে হতো। আমাদের কাছেও লোকজন একত্রিত হলে এভাবে করা উচিত। দেওবন্দের দারুল উলূমে আকাবিরদের যুগ থেকে এ আমল চলে আসছে। (ফয়যুল বারী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৭৮)
সুতরাং রমযান মাসে ফজরের জামাত কিছুটা আগে আদায় করা শরিয়তবিরোধী নয়। তবে মসজিদের জামাতের সময় এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যেন ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায় এবং মুসল্লিদের জন্যও তা সুবিধাজনক হয়।
একাকী নামায ও জামাতের বিধান কি একই?
একাকী নামায পড়ুন বা জামাতে পড়ুন, ফজরের ওয়াক্ত শুরু ও শেষ হওয়ার বিধান একই। অর্থাৎ, উভয় ক্ষেত্রেই সুবহে সাদিকের পর নামায পড়তে হবে এবং সূর্যোদয়ের আগেই তা শেষ করতে হবে।
তবে নামাযের উত্তম সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিবেচনা করা যেতে পারে। হানাফি মাযহাবের সাধারণ নির্দেশনা হলো, ফজরের নামায কিছুটা আলো প্রকাশ পাওয়ার পর আদায় করা উত্তম। অন্যদিকে, রমযানে মুসল্লিদের উপস্থিতি ও সুবিধার কথা বিবেচনা করে অন্ধকার থাকতে জামাত আদায় করার অবকাশ রয়েছে।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতি ও মুহাদ্দিস, জামিয়া বাবুস সালাম, বিমানবন্দর ঢাকা
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন