নারীদের পুলিশে চাকুরি করার বিধান
প্রশ্নঃ ১৬২৪৫৩. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, নারীদের পুলিশের জব কে সমর্থন করে? প্রতিটি মুসলিম দেশে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নারী আছেন। বাংলাদেশে ও অপরাধ সংখ্যায় নারী বেশি, যেহেতু নারীদের শরীরে পুরুষ হাত দিতে পাটবেন না, তাছাড়া পোষাকে ১০/২০ পার্থক্য,প্যান্ট যদি হয় ঢিলা।ইচ্ছে যদি হয় শুধু সেবা? তাহলেও জাহান্নামী?
২৪ জুলাই, ২০২৬
Dhaka
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
নারী হলো পরিবারের শোভা। সন্তানদের লালন-পালন ও সুশিক্ষা, স্বামীর সেবা এবং গৃহের যাবতীয় দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত। এ কারণেই ইসলাম নারীকে জীবিকা অর্জনের অর্থনৈতিক সংগ্রাম থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। যদি নারী ঘর ছেড়ে বাইরের দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তবে পরিবার অগোছালো হয়ে যায়; অনেক সময় তা ধ্বংসের মুখেও পতিত হয়।
কেউ অর্থলোভে, কেউ নারীমুক্তির ধারণা থেকে, আবার কেউ খ্যাতির আকাঙ্ক্ষায় নারীদের এমন সব পদে দেখতে পছন্দ করেন, যা তাদের মর্যাদা ও স্বভাবসিদ্ধ অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তেমন পদগুলোর একটি হলো পুলিশ বিভাগ।
এই বিভাগে নারীর চাকরি করা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। কারণ, এ চাকরি করতে গিয়ে তাকে নানাবিধ শরিয়তবিরোধী কাজ ও গুনাহে জড়িয়ে পড়তে হতে পারে।
এখন আমি পুলিশ বিভাগের কয়েকটি ত্রুটির কথা উল্লেখ করছি, যেগুলোর মাধ্যমে নারীর জন্য এ বিভাগে চাকরি করার শরয়ি অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
(১) নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা (ইখতিলাত):
সবার আগে যে বিষয়টি উল্লেখযোগ্য, তা হলো—এ ধরনের পেশায় নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা (ইখতিলাত) বিদ্যমান থাকে, যা ইসলামে হারাম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আজ এই অবাধ মেলামেশা সমাজকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। বহু অপরাধের অন্যতম কারণ হিসেবে এটিকে উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে স্কুল, কলেজ, বাজার, দোকান, সড়ক, পার্ক, বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং জনসমাগমস্থলে নারী-পুরুষকে একসঙ্গে চলাফেরা করতে দেখা যায়। এমনকি নারীর ক্ষমতায়ন (Women's Empowerment)-এর নামে নারীদেরও পুরুষদের মতো প্রায় সব ধরনের পদ ও দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়েছে।
এর ফলে সমাজের অবস্থা কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তা সবারই জানা। এ দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ব্যভিচারের প্রসার ঘটিয়েছে, পর্দাহীনতা বৃদ্ধি করেছে, নারীর সম্মান ও মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করেছে, অবৈধ প্রেম-ভালোবাসার বিস্তার ঘটিয়েছে, অল্পবয়সীদের মধ্যেও অশ্লীলতার ধারণা সৃষ্টি করেছে, গর্ভপাতের ঘটনা বাড়িয়েছে, নারীর প্রতি সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের পথ উন্মুক্ত করেছে এবং তাদের ন্যায্য অধিকার ও দায়িত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সংক্ষেপে, এর ফলে সমাজে নানাবিধ নৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
ইসলাম পুরুষদেরকেও নারীদের সঙ্গে পর্দার আড়াল থেকে কথা বলতে নির্দেশ দিয়েছে, যাতে নারীরা নিরাপদ থাকে এবং পুরুষদের অন্তরে কোনো অনুচিত চিন্তার উদ্ভব না হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ ۚ ذَٰلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ﴾
অনুবাদ: “আর তোমরা যখন নবী-পত্নীদের কাছে কোনো কিছু চাইবে, তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটি তোমাদের অন্তরের জন্যও অধিক পবিত্র এবং তাদের অন্তরের জন্যও অধিক পবিত্র।” (সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৫৩)
এ দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী বলা হয়, যে ইসলাম নারীদের সঙ্গে পর্দার আড়াল থেকে কথা বলার নির্দেশ দেয়, সে ইসলাম কীভাবে নারীদের খোলা চুল, উন্মুক্ত মুখ, আঁটসাঁট পোশাক, আকর্ষণীয় ভঙ্গি ও দৃষ্টি-আকর্ষণকারী সাজসজ্জাসহ পুরুষদের মাঝে কাজ করার অনুমতি দিতে পারে?
নারী হলো পর্দা, পবিত্রতা, সতীত্ব ও লজ্জাশীলতার প্রতীক। ইসলাম তাকে দৃষ্টি অবনত রাখতে, হিজাব পরিধান করতে, পরপুরুষের সঙ্গে পর্দার আড়াল থেকে কথা বলতে, রাস্তার একপাশ দিয়ে চলতে, এমন কোনো আচরণ না করতে যাতে পুরুষদের আকর্ষণের কারণ হয় এবং পরপুরুষের সঙ্গে নির্জনে অবস্থান (খালওয়া) না করতে নির্দেশ দিয়েছে।
যদি এসব নির্দেশনা মেনে চলা হয়, তবে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা (ইখতিলাত) এবং এর ফলে সৃষ্ট গুরুতর সামাজিক ও নৈতিক সমস্যাগুলো থেকে সমাজ রক্ষা পেতে পারে।
(২) পর্দাহীনতা:
এই পেশায় নারীদের জন্য পর্দাহীনতার বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। পুলিশ বিভাগে একটি নির্ধারিত ইউনিফর্ম রয়েছে, যা নারী-পুরুষ উভয়েরই পরিধান করতে হয়। এই ইউনিফর্ম নারীর শারীরিক গঠন ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। পাশাপাশি এতে মুখমণ্ডল ও মাথা ঢাকার ব্যবস্থাও থাকে না।
ইসলামে নারীদের জন্য এমন পোশাক পরিধান নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা আঁটসাঁট, পাতলা বা শরীরের গঠনকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। একইভাবে পুরুষদের অনুরূপ পোশাক পরিধান করাও নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু পোশাক নয়, নারী ও পুরুষ উভয়কেই একে অপরের সাদৃশ্য গ্রহণ করতেও নিষেধ করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«لعن رسول الله ﷺ المتشبِّهاتِ بالرِّجالِ من النساءِ والمتشبِّهينَ بالنِّساءِ من الرجالِ.»
অনুবাদ: “রাসূলুল্লাহ ﷺ পুরুষদের অনুকরণকারী নারীদের এবং নারীদের অনুকরণকারী পুরুষদের ওপর লানত করেছেন।” (জামে তিরমিযী: ২৭৮৪) https://muslimbangla.com/hadith/32429
নারীর পবিত্রতা ও সতীত্ব রক্ষায় শরিয়তসম্মত হিজাবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাস্তব অভিজ্ঞতাও দেখায় যে, পর্দাহীনতাই অনেক সময় ফিতনা-ফাসাদের কারণ হয় এবং এ ধরনের নারীরাই অসৎ ও লালসাপরায়ণ মানুষের শিকারে পরিণত হন।
বর্ণিত আছে যে, হিজাবের আয়াত নাযিল হওয়ার আগেই হযরত উমর (রাঃ)-এর অন্তরে হিজাবের বিষয়ে চিন্তা জাগে। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলেন, যদি উম্মুল মুমিনীনদের পর্দার নির্দেশ দেওয়া হতো, তবে তা উত্তম হতো। পরে হিজাব সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হয়।
এ কারণেই মুসলিম নারীদের এমন সব চাকরি থেকে বিরত থাকা উচিত, যেখানে পর্দাহীনতা অবশ্যম্ভাবী।
এ প্রসঙ্গে হাদিসে একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে—
«نذرت أختي أن تمشي إلى الكعبة حافيةً حاسرةً ... فقال: مُروها فلتركب و لتختمر ولتحج ولتهد هدياً.»
অনুবাদ: হযরত উকবা ইবন আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমার বোন মানত করেছিলেন যে, তিনি খালি পায়ে ও মাথা খোলা অবস্থায় পায়ে হেঁটে কাবা শরিফে হজ করতে যাবেন।” তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বিষয়টি জানতে পেরে বললেন, “তাকে বলো, সে যেন বাহনে আরোহণ করে, মাথা ঢেকে হজ সম্পন্ন করে এবং একটি পশু কোরবানি দেয়।”
বুখারী: https://muslimbangla.com/hadith/1744
মুসলিম: https://muslimbangla.com/hadith/11153
এখান থেকে একটি কথা স্পষ্ট, যদি সাময়িক ইবাদতের ক্ষেত্রেও মাথা ঢেকে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়ে থাকে, তবে যারা সর্বদা পর্দাহীন অবস্থায় থাকে, তাদের ব্যাপারে আল্লাহই ভালো জানেন।
পুলিশ বিভাগে পূর্ণ শরয়ি হিজাব বজায় রেখে চাকরি করা অত্যন্ত কঠিন। বরং বলা ভালো কিছুতেই সম্ভব নয়। কারণ সেখানে পরপুরুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়, তাদের সঙ্গে কথা বলতে হয়, দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করতে হয় এবং অনেক সময় সফরও করতে হয়। এসব কাজ পূর্ণ পর্দা রক্ষা করে বাস্তবে সম্পন্ন করা কঠিন; এমনকি কেউ তা করতে চাইলেও বিভাগীয় নিয়মকানুনের কারণে অনেক ক্ষেত্রে অনুমতি নাও পেতে পারেন।
৩) গায়রে মাহরাম (অপরিচিত) পুরুষের সঙ্গে নির্জনে অবস্থান (খালওয়াত):
এটি এমন একটি পেশা, যেখানে পুরুষদের সঙ্গে মেলামেশা, কাজকর্ম এবং বিভিন্ন ধরনের সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। অথচ ইসলামে কোনো নারীর জন্য গায়রে মাহরাম পুরুষের সঙ্গে একত্রে বসবাস, ওঠাবসা, খাওয়া-দাওয়া কিংবা একসঙ্গে কাজ করা হারাম।
পুরুষদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশার (ইখতিলাতের) পাশাপাশি আরও একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক বিষয় হলো খালওয়াত (গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের নির্জনে একত্রে অবস্থান)। এটি অশ্লীলতা ও পাপাচারের দিকে নিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
নবী ﷺ বলেছেন—«لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ ثَالِثُهُمَا» (মিশকাতুল মাসাবীহ: ৩০৫৪)
অর্থ: “কোনো পুরুষ যেন কোনো (গায়রে মাহরাম) নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান না করে। কেননা তাদের দু’জনের তৃতীয়জন হয় শয়তান।”
এই হাদীস থেকে সহজেই বোঝা যায়, যেখানে নারী-পুরুষ নির্জনে একত্রে থাকে, সেখানে শয়তান তাদেরকে গুনাহের দিকে প্ররোচিত করার চেষ্টা করে।
একজন নারীকে পুলিশি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এ ধরনের নির্জন পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়া অনেক ক্ষেত্রেই অনিবার্য হতে পারে। তাই যেই এমন পেশায় খালওয়াতে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা বা সম্ভাবনা থাকে, সেই পেশাকে বৈধ বলার কোনো সুযোগ নেই।
নির্জনে (পরপুরুষ-পরনারীর একান্তে অবস্থান) গুনাহের আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। কারণ সেখানে আল্লাহ ছাড়া দেখার মতো আর কেউ থাকে না; মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার মতো নিজের নফস ছাড়া আর কেউ থাকে না; আর গুনাহের স্বাদ গ্রহণের পর বিবেকের তিরস্কার ছাড়া ভর্ৎসনা করারও কেউ থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে তাকওয়া, আল্লাহভীতি (খাশিয়াতুল্লাহ) এবং আখিরাতের জবাবদিহিতার চিন্তাই মানুষকে গুনাহ থেকে রক্ষা করতে পারে।
(৪) মাহরাম ছাড়া সফর
পুলিশের চাকরিতে মাহরাম ছাড়া সফর করাও ইসলামী দৃষ্টিতে আপত্তিকর বলে বিবেচিত। এ ধরনের চাকরিতে কখন কোথায় যেতে হবে, কোথায় বদলি (ট্রান্সফার) হতে হবে—তা আগে থেকে বলা যায় না। সফরের সময় নারীর সঙ্গে মাহরাম থাকা প্রয়োজন; অন্যথায় সে গুনাহগার হবে—যা হাদিাসে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে মাহরাম কোথায়? যে ব্যক্তি মিশনে বা সফরে তার সঙ্গে থাকবে, সে প্রকৃত অর্থে বিশ্বস্ত মানুষ, নাকি মানুষের মুখোশে লুকিয়ে থাকা হিংস্র চরিত্রের অধিকারী—তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।
হযরত ইবন আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
"কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান না করে, এবং কোনো নারী যেন মাহরাম ছাড়া সফর না করে।" তখন এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমার নাম অমুক যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, আর আমার স্ত্রী হজে রওনা হয়েছেন।” তখন নবী ﷺ বললেন, “তুমি যাও, তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হজ সম্পন্ন কর।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩০০৬)
এই হাদীসে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। দ্বীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব জিহাদে অংশগ্রহণের পরিবর্তে নবী ﷺ সেই সাহাবিকে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে মাহরাম হিসেবে হজে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অথচ হজ এমন একটি ইবাদত, যেখানে দৃষ্টি পবিত্র থাকে, অন্তর অধিক পবিত্র হয় এবং অনুভূতি ও চিন্তাও নির্মল থাকে। তবুও হজের সফরেও নারীর সঙ্গে মাহরামের উপস্থিতি অপরিহার্য বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুবহানাল্লাহ!
প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলা নারীর জন্য যে জীবনব্যবস্থা নির্ধারণ করেছেন, তা অত্যন্ত পবিত্র, পরিচ্ছন্ন ও সুস্পষ্ট। একজন নারী যদি ইসলামের নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে জীবনযাপন করেন, তবে তিনি শান্তি ও নিরাপত্তার এক আশ্রয়স্থল হয়ে উঠতে পারেন। আর যখন তিনি সেই সীমারেখা অতিক্রম করেন, তখন সমাজজুড়ে নানা ধরনের ফিতনা-ফাসাদ ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনেকের মতে, বর্তমান যুগের অধিকাংশ ফিতনার পেছনে প্রধানত দুটি বিষয় কাজ করে—নারী ও সম্পদ। এই দুটি বিষয় সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকলে সমাজের অন্যান্য বিষয়ও নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
(৫) নারীদের নেতৃত্ব:
ইসলাম নারীদেরকে পুরুষদের ওপর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের দায়িত্ব থেকেও অব্যাহতি দিয়েছে। এমন কোনো পেশা বা কাজ, যেখানে একজন নারীকে পুরুষদের ওপর নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব বা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়—এ ধরনের কাজকে অনেক আলেম শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ মনে করেন না। পুলিশের বিভাগও এক ধরনের নেতৃত্বমূলক বিভাগ হিসেবে বিবেচিত হয়।
নারী হলো ঘরের শোভা, বাইরের প্রদর্শনীর বস্তু নয়। যারা নারীমুক্তির নামে অশ্লীলতা ও কুপ্রবৃত্তিকে উৎসাহিত করেছে, তারা নারীদের বিভিন্ন পদ ও আসনে বসিয়ে তাদের স্বাভাবিক দুর্বলতাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে।
আমরা যখন কুরআনের এই শিক্ষাকে ভুলে গেছি, তখন নারীও অপমানিত হয়েছে, পুরুষও অপমানিত হয়েছে।
﴿وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ﴾
অনুবাদ: “তোমরা নিজ নিজ ঘরে মর্যাদার সঙ্গে অবস্থান করো এবং প্রাচীন জাহেলিয়াতের যুগের নারীদের মতো নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করে বেড়িও না।” (সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৩৩)
প্রয়োজনের কারণে কোনো নারী যদি ঘরের বাইরে যান, তবে তাঁর মধ্যে লজ্জাশীলতা ও শালীনতা থাকা উচিত। এমন সাজসজ্জা বা সৌন্দর্য প্রদর্শন করা উচিত নয়, যা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যে ইসলাম নারীকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাইরে বের হতে নিরুৎসাহিত করে এবং বাইরে চলাফেরারও শালীন পদ্ধতি শিক্ষা দেয়, সেই ইসলাম কীভাবে নারীকে বাজার-ঘাটের শোভা হতে অনুমতি দিতে পারে?
হযরত আবু উসাইদ আনসারী (রাঃ) বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছেন—একদিন তিনি মসজিদ থেকে বের হচ্ছিলেন। তখন পথের মধ্যে নারী-পুরুষের মিশ্র চলাচল হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ নারীদের উদ্দেশে বললেন—
«استأخرن؛ فإنه ليس لكن أن تحققن الطريق، عليكن بحافات الطريق.»
অনুবাদ: “তোমরা কিছুটা পেছনে থাকো। রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলা তোমাদের জন্য উপযুক্ত নয়; তোমরা রাস্তার কিনারা দিয়ে চলবে।” (আবু দাউদ: ৫২৭২)
এরপর নারীরা দেয়ালের একেবারে গা ঘেঁষে চলতে লাগলেন। এমনকি দেয়ালের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘেঁষে চলার কারণে তাঁদের কাপড় দেয়ালে আটকে যেত।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ ۚ فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِّلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ﴾
অনুবাদ: “পুরুষরা নারীদের অভিভাবক ও দায়িত্বশীল। কারণ আল্লাহ তাদের একের ওপর অন্যকে কিছু বৈশিষ্ট্যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং তারা নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে। সুতরাং নেককার নারীরা অনুগত হয় এবং আল্লাহর হেফাজতে অদৃশ্য বিষয়েরও সংরক্ষণ করে।” (সূরা আন-নিসা, ৪:৩৪)
হযরত আবু বকরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ জানতে পারলেন যে পারস্যবাসীরা কিসরার কন্যাকে তাদের শাসক করেছে, তখন তিনি বললেন—
«لن يفلح قوم ولَّوا أمرهم امرأة.»
অনুবাদ: “যে জাতি তাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব একজন নারীর হাতে অর্পণ করে, তারা কখনো সফল হবে না।” (সহীহ বুখারী: ৪৪২৫)
ওপরোক্ত হাদিসের আলোকেও প্রতিয়মাণ হয় যে, অস্ত্রধারণ, সামরিক বা প্রতিরক্ষামূলক দায়িত্ব পালন নারীর জন্য নির্ধারিত নয়। তাই পুলিশ, সেনাবাহিনী বা সশস্ত্র বাহিনীর মতো বিভাগে যোগদানকেও বৈধ মনে করা হয় না। ইসলাম যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংগ্রামের দায়িত্ব পুরুষদের ওপর ন্যস্ত করেছে।
হযরত আয়িশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেছিলেন—
«يا رسول الله، على النساء جهاد؟ قال: نعم، عليهن جهاد لا قتال فيه: الحج والعمرة.»
অনুবাদ: “হে আল্লাহর রাসূল! নারীদের ওপরও কি জিহাদ রয়েছে?”
তিনি বললেন, “হ্যাঁ, তাদের ওপরও জিহাদ রয়েছে; তবে তা এমন জিহাদ যাতে যুদ্ধ নেই। আর তা হলো হজ ও উমরা।” (সুনান ইবন মাজাহ: ২৩৬২)
অতএব, এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী কোনো মুসলিম নারীর নেতৃত্বমূলক পদ গ্রহণ করা, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া কিংবা জীবিকার উদ্দেশ্যে পুলিশের কোনো বিভাগে চাকরি করা উচিত নয়। বিশেষ করে এসব কাজ সাধারণত তরুণদের দ্বারা সম্পাদিত হয়। আর একজন যুবতী নারী যদি পর্দাহীন অবস্থায় পুরুষদের মধ্যে অবস্থান করেন, তবে তার পরিণতি কী হতে পারে—তা সহজেই অনুমেয়।
তবে, পুলিশের এমন কোনো বিভাগে—যেমন নারী আসামিদের তদারকি, নারী বন্দিদের দেখাশোনা বা নারীদের তদন্তসংক্রান্ত কাজ—যদি সম্পূর্ণ নারীদের মধ্যেই দায়িত্ব পালন করতে হয়, সেখানে পুরুষের সংশ্লিষ্টতা না থাকে, অপ্রয়োজনীয় পরপুরুষের যাতায়াত না থাকে এবং পর্দা, সম্মান ও মর্যাদা সম্পূর্ণভাবে রক্ষা করে কাজ করার সুযোগ থাকে, তাহলে এ ধরনের দায়িত্ব পালনের অবকাশ আছে।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
সাইদুজ্জামান কাসেমি
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১