হালাল ও হারাম উপার্জনের মাধ্যম এবং আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্যের শরয়ি বিধান
প্রশ্নঃ ১৭৩০৯৯. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, হযরত জি। আমি জানতে চাই বর্তমান হালাল ইনকাম কি কি রয়েছে আর হারাম ইনকাম দিয়ে কি রয়েছে বিস্তারিত জানতে চায়। আধুনিক ইনকাম এটা কি জায়েজ আবার যদি বলেন ব্যবসা হালাল তাহলে এখন বর্তমান জামানায় ব্যবসার মধ্যে তো সিন্ডিকেট করা হচ্ছে তাহলে এটা কি জায়েজ হবে। দলিলসহ
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
উত্তর:
আপনার প্রশ্নটি বেশ ব্যাপক। কারণ হালাল-হারাম উপার্জনের বিষয়টি শুধু পেশা বা ব্যবসার নামের ওপর নির্ভর করে না; বরং উপার্জনের মাধ্যম, পদ্ধতি ও লেনদেনের ধরনও এর সঙ্গে জড়িত। তাই সংক্ষেপে এ বিষয়ে কিছু মৌলিক নীতিমালা তুলে ধরা হলো।
হালাল উপার্জনের মূলনীতি
ইসলামের দৃষ্টিতে মূলত যেকোনো বৈধ পেশা ও ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জন করা জায়েজ, যদি তাতে শরিয়ত নিষিদ্ধ কোনো বিষয় না থাকে। উপার্জনের মাধ্যম ও পদ্ধতি মূলত বৈধ হলে তা থেকে অর্জিত আয় হালাল। আর তাতে শরিয়ত নিষিদ্ধ কোনো বিষয় যুক্ত হলে সেই উপার্জনও অবৈধ হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ
অর্থাৎ, হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা। (সুরা নিসা, ৪:২৯)
হালাল উপার্জনের মাধ্যম ও দৃষ্টান্ত
ইসলামে হালাল উপার্জনের অনেক মাধ্যম রয়েছে। যেমন-
১. ব্যবসা-বাণিজ্য: হালাল পণ্য বৈধ পন্থায় ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে লাভবান হওয়া। তবে পণ্যের পাশাপাশি ব্যবসার পদ্ধতিও শরিয়তসম্মত হতে হবে। ধোঁকা, প্রতারণা, মিথ্যা, সুদ কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করার কোনো বিষয় থাকা যাবে না।
২. চাকরি ও পেশা: সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বৈধ দায়িত্ব পালন করে বেতন গ্রহণ করা। এক্ষেত্রে চাকরির নিয়োগপদ্ধতি এবং চাকরির কাজ উভয়ই বৈধ হওয়া জরুরি।
৩. কৃষি ও উৎপাদন: নিজের জমিতে কিংবা বৈধভাবে ভাড়া বা লিজ নেওয়া জমিতে ফসল উৎপাদন, পশুপালন ও অন্যান্য বৈধ উৎপাদনমূলক কাজের মাধ্যমে উপার্জন করা।
৪. কারিগরি ও সেবামূলক কাজ: রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান, গাড়ি মেরামত, পরিবহন, কুরিয়ার, নির্মাণকাজ, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট পরিচালনা।
৫. আধুনিক ও অনলাইন উপার্জন: ফ্রিল্যান্সিং, আউটসোর্সিং, অনলাইন ব্যবসা, ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট তৈরি, লেখালেখি, অনুবাদ ও অন্যান্য আধুনিক পেশার মাধ্যমেও উপার্জন করা জায়েজ। তবে কাজ, সেবা ও উপার্জনের পদ্ধতি হালাল হতে হবে। কাজের নাম আধুনিক হলেই তা হারাম হয়ে যায় না; আবার অনলাইনভিত্তিক হলেই তা হালাল হয়ে যায় না।
হারাম উপার্জনের কয়েকটি মাধ্যম
ইসলামে যেসব পদ্ধতিতে উপার্জন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
১. সুদ: ঋণ দিয়ে শর্তসাপেক্ষে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করা এবং সুদভিত্তিক লেনদেন করা হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
অর্থাৎ, আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। (সুরা বাকারা, ২৭৫)
২. জুয়া ও লটারি: ভাগ্যনির্ভর পদ্ধতিতে অর্থের লেনদেন এবং জুয়া-লটারির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ হারাম। (সুরা মায়িদা, ৯০)
৩. চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজি: অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করে উপার্জন করা হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ
অর্থাৎ, হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না। (সুরা নিসা, ২৯)
৪. প্রতারণা ও ভেজাল: পণ্যে ভেজাল দেওয়া, মিথ্যা বিজ্ঞাপন, পণ্যের দোষ গোপন করা, ওজনে কম দেওয়া এবং ক্রেতাকে ধোঁকা দিয়ে অর্থ উপার্জন করা হারাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১)
৫. ঘুষ ও দুর্নীতি: ঘুষ গ্রহণ, সরকারি বা বেসরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, টেন্ডারবাজি, অবৈধ কমিশন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ উপার্জন করা হারাম।
৬. হারাম পণ্য ও সেবা: মদ, নেশাজাতীয় দ্রব্য, জুয়া এবং অন্যান্য হারাম কাজে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করে অর্থ উপার্জন করা নাজায়েজ।
৭. জবরদখল ও আত্মসাৎ: অন্যের জমি, সম্পদ বা অধিকার অন্যায়ভাবে দখল করে তা থেকে উপার্জন করা হারাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে এক বিঘত জমিও দখল করে, কিয়ামতের দিন তার গলায় সাত স্তবক জমি পরিয়ে দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩১৯৮)
৮. যৌতুক: বিয়ের শর্ত বা সামাজিক চাপের মাধ্যমে কনের পরিবারের কাছ থেকে টাকা-পয়সা বা সম্পদ আদায় করা জুলুম ও অন্যায়। এভাবে অর্জিত সম্পদ গ্রহণ করা জায়েজ নয়।
ব্যবসায় সিন্ডিকেট করা কি জায়েজ?
আপনার প্রশ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, বর্তমানে অনেক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। এ বিষয়ে শরিয়তের বিধান হলো, ব্যবসায়ীরা নিজেদের মধ্যে এমন কোনো যোগসাজশ করতে পারবেন না, যার মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্য আটকে রাখা হয় এবং অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের উদ্দেশ্যে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এটি অন্যায় ও জুলুমের অন্তর্ভুক্ত।
বিশেষত খাদ্যদ্রব্য ও মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা এবং মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অস্বাভাবিক মূল্য আদায় করা শরিয়তে নিষিদ্ধ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ احْتَكَرَ فَهُوَ خَاطِئٌ
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি মজুতদারি করে, সে পাপী। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬০৫)
তবে ব্যবসায়ীরা নিজেদের মধ্যে বৈধ কোনো বিষয়ে সমঝোতা বা যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করলেই তা সিন্ডিকেট বা হারাম হয়ে যায় না। বরং দেখতে হবে, এর মাধ্যমে কারও অধিকার নষ্ট হচ্ছে কি না, বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হচ্ছে কি না এবং সাধারণ মানুষের ওপর অন্যায়ভাবে মূল্য চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে কি না।
উল্লেখ্য, মনে রাখতে হবে, শুধু পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করলেই তা হালাল হয়ে যায় না; বরং উপার্জনের মাধ্যম ও পদ্ধতিও হালাল হওয়া জরুরি। তাই কোনো নতুন ব্যবসা, চাকরি, অনলাইন ইনকাম কিংবা আধুনিক পেশায় যুক্ত হওয়ার আগে সেটির কার্যপদ্ধতি ভালোভাবে যাচাই করা উচিত। বিশেষত যেসব পদ্ধতিতে কমিশন, বোনাস, বিনিয়োগ, প্যাকেজ, রেফারেল বা দল গঠনের মাধ্যমে আয় করা হয়, সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ কোনো অভিজ্ঞ মুফতির কাছে পেশ করে শরয়ি বিধান জেনে নিতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জন করার এবং হারাম উপার্জন থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন