আমাদের জীবনে দরূদ শরীফের প্রয়োজনীয়তা ও উপকারিতা
প্রশ্নঃ ১৭৩৩১৯. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, মোহতারাম, দরূদ পাঠে ও বিভিন্ন আমলের বিনিময়ে আমরা আল্লাহর রহমত প্রাপ্ত হই। জানার বিষয় হলো, দরূদ আমাদের জীবনের কোন কোন স্তরে কীভাবে কি কি কাজে লাগে? জাযাকুমুল্লহু খইর।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
দরূদ শরীফ পাঠ করা অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ একটি আমল। এটি শুধু সওয়াব অর্জনের মাধ্যম নয়; বরং দুনিয়া ও আখিরাতের বিভিন্ন কল্যাণ লাভেরও অন্যতম উপায়। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দরূদ পাঠের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতা নিম্নে তুলে ধরা হলো-
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরূদ পাঠ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরূদ পাঠ করো এবং অধিক পরিমাণে সালাম পাঠাও। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৫৬)
দরূদ পাঠের মাধ্যমে আমরা যেসব কল্যাণ লাভ করতে পারি-
১. আল্লাহর রহমত লাভ ও মর্যাদা বৃদ্ধি হয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন-
مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا
অর্থ: যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার প্রতি দশটি রহমত নাযিল করবেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৩৮৪)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, এর মাধ্যমে দশটি গুনাহ মাফ হয় এবং দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। (সুনানে নাসায়ী, হাদীস: ১২৯৭)
২. ফেরেশতাদের দুআ ও মাগফিরাত লাভ হয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন-
مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً، لَمْ تَزَلِ الْمَلَائِكَةُ تُصَلِّي عَلَيْهِ مَا صَلَّى عَلَيَّ، فَلْيُقِلَّ عَبْدٌ مِنْ ذَلِكَ أَوْ لِيُكْثِرْ
অর্থ: যে ব্যক্তি আমার প্রতি দরূদ পাঠ করে, সে যতক্ষণ দরূদ পাঠ করতে থাকে, ফেরেশতারা ততক্ষণ তার জন্য দুআ করতে থাকেন। সুতরাং বান্দা চাইলে কম পড়তে পারে, চাইলে বেশি পড়তে পারে। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস: ৯০৭)
৩. দুআর মাধ্যমে নিজের প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে বিশেষ উপকার পাওয়া যায়।
হযরত উবাই ইবনে কা‘ব রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করলাম, আমার দুআর কতটুকু অংশ আপনার প্রতি দরূদের জন্য নির্ধারণ করব? তিনি বললেন, তোমার ইচ্ছামতো। আমি যখন বললাম, তাহলে আমার সমস্ত দুআই যদি আপনার প্রতি দরূদের জন্য নির্ধারণ করি? তিনি বললেন-
إِذًا تُكْفَى هَمَّكَ، وَيُغْفَرُ لَكَ ذَنْبُكَ
অর্থ: তাহলে তোমার দুশ্চিন্তা ও প্রয়োজনের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে এবং তোমার গুনাহ ক্ষমা করা হবে। (জামে তিরমিযী, হাদীস: ২৪৫৭)
৪. কিয়ামতের দিন নবীজির নৈকট্য লাভ হয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন-
أَوْلَى النَّاسِ بِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَكْثَرُهُمْ عَلَيَّ صَلَاةً
কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে সেই ব্যক্তি, যে আমার প্রতি সবচেয়ে বেশি দরূদ পাঠ করেছে। (জামে তিরমিযী, হাদীস: ৪৮৪)
৫. নবীজির শাফাআত লাভের সৌভাগ্য হয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে বিশেষ একটি দুআর মাধ্যমে তাঁর শাফাআত লাভের সুসংবাদ এসেছে। দুআটি হলো-
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ، وَأَنْزِلْهُ الْمَقْعَدَ الْمُقَرَّبَ عِنْدَكَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি রহমত নাযিল করুন এবং কিয়ামতের দিন তাঁকে আপনার নিকটবর্তী সম্মানিত স্থানে অধিষ্ঠিত করুন। (তবারানী, আলমুজামুল কাবীর, ৪৪৮১)
৬. সদকা করার সামর্থ্য না থাকলেও সদকার সওয়াব লাভ হয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন-
أَيُّمَا رَجُلٍ مُسْلِمٍ لَمْ يَكُنْ عِنْدَهُ صَدَقَةٌ فَلْيَقُلْ فِي دُعَائِهِ: اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ عَبْدِكَ وَرَسُولِكَ، وَصَلِّ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ، وَالْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ، فَإِنَّهَا زَكَاةٌ
কোনো মুসলিমের কাছে সদকা করার মতো কিছু না থাকলে সে যেন দুআয় বলে, হে আল্লাহ! আপনার বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদের প্রতি রহমত নাযিল করুন এবং মুমিন ও মুসলিম নারী-পুরুষের প্রতিও রহমত নাযিল করুন। কেননা, এটি তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে। (সহীহ ইবনে হিববান, ৫১৭)
৭. নবীজি ﷺ-এর কাছে নিজের সালাম পৌঁছানো যায়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন-
إِنَّ لِلَّهِ فِي الْأَرْضِ مَلَائِكَةً سَيَّاحِينَ يُبَلِّغُونِي مِنْ أُمَّتِي السَّلَامَ
আল্লাহর কিছু ফেরেশতা পৃথিবীতে বিচরণ করেন, তাঁরা আমার উম্মতের পক্ষ থেকে পাঠানো সালাম আমার কাছে পৌঁছে দেন। (সুনানে নাসায়ী, হাদীস: ১২৮২)
মোটকথা : দরূদ শরীফের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর রহমত লাভ, গুনাহ মাফ, মর্যাদা বৃদ্ধি, ফেরেশতাদের দুআ, দুআর ক্ষেত্রে বিশেষ কল্যাণ, দুশ্চিন্তা ও প্রয়োজন থেকে মুক্তি এবং আখিরাতে নবীজি ﷺ-এর নৈকট্য ও শাফাআত লাভের সৌভাগ্য অর্জন করতে পারি। তাই প্রতিদিনের জীবনে, বিশেষ করে নামাজের পর, দুআর আগে-পরে, অবসর সময়ে এবং জুমার দিনে বেশি বেশি দরূদ পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বেশি বেশি দরূদ ও সালাম পাঠ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন