BIN নম্বর ব্যবহারের মাধ্যমে ভ্যাট ও কর ফাঁকি দেওয়া
প্রশ্নঃ ১৭৩২৩৫. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, শায়েখ! ফেসবুক বুস্টে ১৫% ভ্যাট এড়ানোর জন্য অনলাইনে ২০০–৩০০ টাকায় BIN নম্বর কেনা যায়। এই BIN নম্বর বিক্রি করা এবং তা কিনে বুস্ট চালিয়ে ভ্যাট না দেওয়া শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ কি না? কুরআন-হাদিসের দলিলসহ জানালে উপকৃত হব। জাযাকাল্লাহু খাইরান।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
BIN বা Business Identification Number (ব্যবসায় শনাক্তকরণ নম্বর)। যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক প্রদত্ত একটি নিবন্ধন নম্বর, যা কোনো ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট-সংক্রান্ত পরিচয় শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়। ফেসবুক বুস্টে প্রযোজ্য ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে অবৈধ BIN নম্বর কেনা, অথবা নিজের নামে বৈধভাবে নিবন্ধিত নয়—এমন BIN ব্যবহার করে ভ্যাট পরিশোধ এড়িয়ে যাওয়া শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ নয়। একইভাবে, জেনেশুনে এ উদ্দেশ্যে BIN নম্বর বিক্রি করে সহযোগিতা করাও জায়েজ হবে না।
তবে এখানে একটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে: বৈধভাবে নিজের ব্যবসার জন্য BIN গ্রহণ ও ব্যবহার করা এক বিষয়, আর অন্যের BIN কিনে নিজের লেনদেনে ব্যবহার করে কর ফাঁকি দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
এর সাথে কয়েকটি নিষিদ্ধ বিষয় সম্পৃক্ত
এক. কর/রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া:
কেননা এর মাধ্যমে মূলত কর/রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে যায় অন্যায়। কুরআনুল কারিমে অন্যায়ভাবে সম্পদ ভক্ষণ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ
হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না। তবে পারস্পরিক সম্মতিক্রমে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা। সূরা আন-নিসা, ৪:২৯।
দুই. প্রতারণার আশ্রয়
এই পদ্ধতির মাধ্যমে বৈধ পাওনা বা আইনগতভাবে প্রাপ্য অর্থ প্রতারণার মাধ্যমে এড়িয়ে যাওয়া হয়। যা অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রহণের অন্তর্ভুক্ত। অন্যের BIN ব্যবহার করে নিজের পরিচয় বা কর-সংক্রান্ত তথ্য গোপন করা এ ধরনের প্রতারণার একটি দৃষ্টান্ত।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا
যে ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।সহীহ মুসলিম, হাদিস ১০২।
তিন. চুক্তি ও অঙ্গীকার ভঙ্গ করা
রাষ্ট্রের বৈধ আইন ও নাগরিক হিসেবে গৃহীত আইনগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করাও অঙ্গীকার রক্ষার অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং আইনত প্রযোজ্য কর গোপনে ফাঁকি দেওয়া জায়েজ নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ
হে মুমিনগণ! তোমরা চুক্তিসমূহ পূর্ণ করো। সূরা আল-মায়িদা, ৫:১।
ফিকহের মূলনীতি
ফিকহের একটি প্রসিদ্ধ মূলনীতি হলো—
الضَّرَرُ يُزَالُ
ক্ষতি দূর করতে হবে।
আরেকটি প্রসিদ্ধ হাদিসের মূলনীতি—
الْمُسْلِمُونَ عَلَى شُرُوطِهِمْ
মুসলমানগণ তাদের বৈধ শর্তাবলির ওপর অটল থাকবে। সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৩৫৯৪।
এখানে বৈধ শর্তের কথা বলা হয়েছে। কোনো চুক্তি বা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতারণা ও অবৈধ সুবিধা গ্রহণ বৈধ হয়ে যায় না।
BIN নম্বরের ক্ষেত্রে বাস্তব অবস্থা কী?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয় আছে। বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) তথ্য অনুযায়ী: BIN হলো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পরিচয়সংক্রান্ত নম্বর। নিবন্ধনের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব তথ্য ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ভিত্তিতে আবেদন করতে হয়। BIN পাওয়া মানেই ভ্যাট থেকে অব্যাহতি পাওয়া নয়।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে BIN ব্যবহার করে বিদেশি ডিজিটাল সেবা গ্রহণের সময় সরাসরি ভ্যাট পরিশোধের দায়িত্ব গ্রাহকের ওপর চলে আসতে পারে।
সূত্র: NBR-এর VAT FAQ এবং VAT and Supplementary Duty Act, 2012-এর ১৫ ও ১৬ ধারা।
অতএব, কেউ যদি নিজের ব্যবসার বৈধ BIN ব্যবহার করে ফেসবুকের বিজ্ঞাপন চালান, তাহলে ফেসবুকের ইনভয়েসে আলাদাভাবে ১৫% ভ্যাট না আসতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ভ্যাটের দায় একেবারে শেষ হয়ে গেছে। আইন অনুযায়ী নিজের প্রাপ্য ভ্যাট নিজেকেই পরিশোধ করতে হতে পারে।
আর যদি অন্যের BIN কিনে ব্যবহার করা হয়, অথচ বিজ্ঞাপনের ক্রেতা বা প্রকৃত সেবাগ্রহীতা সেই BIN-ধারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান না হয়, তাহলে সেখানে ভুল পরিচয় ও কর-সংক্রান্ত তথ্যের অসত্য উপস্থাপনের বিষয় রয়েছে।
BIN বিক্রেতা ও ক্রেতার পৃথক বিধান
এখানে দুটি অবস্থা:
১। যদি সে অন্যের নামে নিবন্ধিত BIN অনুমতি ছাড়া বিক্রি করে, অথবা জেনেশুনে ক্রেতাকে ভ্যাট ফাঁকির সুযোগ করে দেয়, তাহলে তার এ কাজ নাজায়েজ। এ থেকে অর্জিত আয়ও নাজায়েজ হবে।
২। যদি সে বৈধভাবে কোনো ব্যক্তির BIN নিবন্ধন, পরামর্শ বা কাগজপত্র প্রস্তুতের কাজ করে এবং এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেয়, তাহলে তা জায়েজ হতে পারে। কারণ এখানে সে প্রতারণা করছে না; বৈধ সেবা দিচ্ছে।
এমনিভাবে যদি তার উদ্দেশ্য হয় অন্যের ব্যবসায়িক পরিচয় ব্যবহার করে নিজের প্রযোজ্য ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া, তাহলে তা নাজায়েজ হবে। কারণ এতে মিথ্যা পরিচয়, প্রতারণা এবং আইনগত দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার বিষয় রয়েছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম
কেউ যদি বৈধভাবে নিজের নামে BIN নিবন্ধন করেন এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী সেই BIN ব্যবহার করে ভ্যাট পরিশোধের দায়িত্ব নিজে পালন করেন, তাহলে ফেসবুকের বিল থেকে সরাসরি ১৫% ভ্যাট কেটে না নেওয়ার কারণে তাকে ভ্যাট ফাঁকিদাতা বলা যাবে না। অর্থাৎ, ভ্যাট আদায়ের পদ্ধতি পরিবর্তন হওয়া আর ভ্যাটের দায় থেকে অবৈধভাবে মুক্তি নেওয়া এক বিষয় নয়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: বাংলাদেশের ভ্যাট আইনে কার ওপর কতটুকু ভ্যাট প্রযোজ্য, তা ব্যবসার ধরন, নিবন্ধনের অবস্থা এবং সেবার প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। তাই প্রত্যেক ফেসবুক বুস্ট ব্যবহারকারীর ওপর একইভাবে ১৫% ভ্যাটের দায় বর্তায়—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না।
NBR-এর সরকারি ওয়েবসাইট: https://nbr.gov.bd/?utm_source=chatgpt.com
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন