গোপাল ভাঁড় কার্টুন: বিনোদনের আড়ালে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রভাব- শরয়ি পর্যালোচনা
প্রশ্নঃ ১৭৩৩৪৩. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, গোপাল ভার কার্টুন দেখা কি ঠিক?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
গোপাল ভাঁড় কার্টুন দেখা থেকে বিরত থাকাই একজন সচেতন মুসলিমের জন্য অধিক সমীচীন। বিশেষত যেসব মুসলিম পরিবার সন্তানদের ইসলামী আকীদা, আদর্শ ও মূল্যবোধের আলোকে গড়ে তুলতে চান, তাঁদের জন্য এ ধরনের কার্টুনকে নিয়মিত বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। কারণ, এতে শিক্ষণীয় কিছু বিষয় থাকলেও সামগ্রিকভাবে এর ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও বিভিন্ন উপাদানে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
১. হিন্দু ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আবহ
গোপাল ভাঁড় কার্টুন মূলত রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজদরবার ও তৎকালীন হিন্দু সমাজের সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে নির্মিত। এতে রাজা, রাজপুরোহিত, পূজারি, জ্যোতিষী, দেবদেবী, পূজা-পার্বণ ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ থাকতে পারে। পাশাপাশি ধুতি, সিঁদুর, বিশেষ ধরনের পোশাক-পরিচ্ছদ ও সাজসজ্জার মাধ্যমে হিন্দু ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিচয়ও ফুটে ওঠে।
যদিও এসব পোশাক ও সংস্কৃতির সবকিছুই স্বতন্ত্রভাবে ধর্মীয় বিধান নয়, তবুও কার্টুনটির সামগ্রিক পরিবেশ একটি বিশেষ ধর্মীয় সংস্কৃতিকে তুলে ধরে। অন্য ধর্মের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা এবং তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানকে বিনোদন বা অনুকরণের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করা এক নয়। মুসলিম শিশুদের নিজস্ব ইসলামী পরিচয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা জরুরি।
২. শিরক ও আকীদাবিরোধী বিষয় গ্রহণের আশঙ্কা
কোনো কোনো পর্বে দেবদেবীর পূজা, মূর্তির সামনে প্রার্থনা কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান উপস্থাপিত হতে পারে। শিশুরা এসবের ধর্মীয় তাৎপর্য না বুঝে বিনোদনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। ফলে এসব বিষয় তাদের কাছে স্বাভাবিক ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে। অথচ ঈমান ও তাওহিদ একজন মুসলিমের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
৩. অনৈতিক আচরণ ও নৈতিক অবক্ষয়ের আশঙ্কা
এ ধরনের কার্টুনে ধোঁকা, প্রতারণা, মিথ্যা, চালাকি, ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও অন্যকে বোকা বানানোর মাধ্যমে হাস্যরস সৃষ্টি করা হয়। যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগুলোর মাধ্যমে অন্যায়ের সমালোচনা করা হয়, কিন্তু শিশুরা সব সময় অন্তর্নিহিত শিক্ষা বুঝতে পারে না; বরং চরিত্রের আচরণ অনুকরণ করতে পারে। ফলে মিথ্যা, প্রতারণা ও অন্যকে অপমান করার প্রবণতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ
‘হে ঈমানদারগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে উপহাস না করে।’ (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১১)
৪. গান-বাজনা ও অনুপযুক্ত দৃশ্য
এ ধরনের কার্টুনে গান-বাজনা, বাদ্যযন্ত্র, নারী-পুরুষের অনিয়ন্ত্রিত মেলামেশা কিংবা অন্যান্য অনুপযুক্ত দৃশ্য থাকতে পারে। এসব বিষয় শরিয়তের দৃষ্টিতে পৃথকভাবে বিবেচ্য।
৫. সময় ও মেধার অপচয়
দীর্ঘ সময় কার্টুন দেখার ফলে পড়াশোনা, খেলাধুলা, শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং উপকারী কাজ ব্যাহত হতে পারে। শুধু শিশু নয়, বড়দের ক্ষেত্রেও অনর্থক বিনোদনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা অনুচিত। যে বিনোদনে উপকারের তুলনায় ক্ষতির আশঙ্কা বেশি, তা পরিহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
৬. উত্তম বিকল্প বিনোদন
শিশুদের আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের ঈমান, চরিত্র ও মেধার বিকাশে সহায়ক বিনোদনের ব্যবস্থা করা অভিভাবকদের দায়িত্ব। যেমন- খেলাধুলা, শারীরিক ব্যায়াম, সুন্দর পরিবেশে ঘুরতে যাওয়া, শিক্ষণীয় বই পড়া, উপকারী গল্প শোনা এবং বয়সোপযোগী নির্ভেজাল শিক্ষামূলক বিষয় দেখা। এসবের মাধ্যমে শিশুরা আনন্দের পাশাপাশি বাস্তব উপকারও লাভ করতে পারে।
সুতরাং, গোপাল ভাঁড় কার্টুনে কিছু শিক্ষণীয় ও বুদ্ধিদীপ্ত বিষয় থাকলেও এর সামগ্রিক ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক আবহ, আকীদাবিরোধী উপস্থাপনা, গান-বাজনা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও অনৈতিক আচরণের অনুকরণের আশঙ্কা বিবেচনায় একজন সচেতন মুসলিমের জন্য এটি পরিহার করাই অধিক সমীচীন। বিশেষত সন্তানদের দ্বীনদার ও নৈতিকভাবে গড়ে তুলতে আগ্রহী অভিভাবকদের উচিত এ ধরনের কার্টুনের পরিবর্তে অধিক উপকারী ও সংশয়মুক্ত বিনোদনের ব্যবস্থা করা।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন